আজ আন্তর্জাতিক চাঁদ দিবস

আকাশের দিকে তাকালে যে জ্যোতিষ্কটি আমাদের সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে, সেটি হলো চাঁদ। হাজার বছর ধরে মানুষের কৌতূহল, কল্পনা, সাহিত্য, বিজ্ঞান এবং মহাকাশ গবেষণার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু এই চাঁদ। আর সেই চাঁদকে ঘিরেই প্রতি বছর ২০ জুলাই পালন করা হয় আন্তর্জাতিক চাঁদ দিবস।
এই দিনটি শুধু চাঁদকে উদযাপনের জন্য নয়। এটি মানবজাতির অন্যতম বড় বৈজ্ঞানিক অর্জন, মহাকাশ গবেষণার ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের চন্দ্র অভিযানের গুরুত্ব স্মরণ করারও একটি উপলক্ষ।
১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই ইতিহাস সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপোলো ১১ মিশন। এই দিনেই মহাকাশচারী নিল আর্মস্ট্রং প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদের মাটিতে পা রাখেন। তাঁর কিছুক্ষণ পরেই বাজ অলড্রিনও চাঁদে নামেন। মাইকেল কলিন্স তখন কমান্ড মডিউলে চাঁদকে প্রদক্ষিণ করছিলেন।
নিল আর্মস্ট্রংয়ের সেই বিখ্যাত উক্তি আজও ইতিহাসের অংশ। ‘একজন মানুষের জন্য এটি ছোট একটি পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য এটি ছিল এক বিশাল অগ্রগতি।’
এই ঘটনাই মহাকাশ গবেষণার নতুন যুগের সূচনা করে।
২০২১ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০ জুলাইকে আন্তর্জাতিক চাঁদ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর উদ্দেশ্য হলো মহাকাশ গবেষণায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা, চাঁদ সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ বাড়ানো এবং শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল মহাকাশ অনুসন্ধানকে উৎসাহিত করা।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই দিনটি নানা কর্মসূচির মাধ্যমে পালন করে।
চাঁদে মানুষের অবতরণ শুধু একটি মহাকাশ অভিযান ছিল না। এটি ছিল বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিতের সম্মিলিত সাফল্যের প্রতীক। এই অভিযানের মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তির উন্নয়ন হয়, মহাকাশ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি পায় এবং ভবিষ্যতের বিভিন্ন মহাকাশ মিশনের ভিত্তি তৈরি হয়।
অনেকে মনে করেন, একবার মানুষ চাঁদে গেছে, তাই আর গবেষণার প্রয়োজন নেই। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন।
বিজ্ঞানীরা এখন জানতে চাইছেন, চাঁদে স্থায়ী গবেষণা কেন্দ্র তৈরি করা সম্ভব কি না। সেখানে বরফের আকারে পানি আছে কি না, ভবিষ্যতে মানুষ দীর্ঘ সময় বসবাস করতে পারবে কি না এবং চাঁদকে ব্যবহার করে আরও দূরের গ্রহে অভিযান চালানো সম্ভব হবে কি না, এসব বিষয় নিয়ে গবেষণা চলছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আর্টেমিস কর্মসূচি, ভারতের চন্দ্রযান, চীনের চাং'ই এবং জাপানসহ বিভিন্ন দেশের চন্দ্র মিশন এই গবেষণাকে আরও এগিয়ে নিচ্ছে।
চাঁদ সম্পর্কে কিছু মজার তথ্য
- পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার।
- চাঁদে একদিন প্রায় ২৯.৫ পৃথিবী দিনের সমান।
- চাঁদে বায়ুমণ্ডল প্রায় নেই বললেই চলে।
- চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ। তাই সেখানে মানুষের ওজন অনেক কম মনে হয়।
- চাঁদের কারণেই পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হয়।
- চাঁদ ধীরে ধীরে প্রতি বছর প্রায় ৩.৮ সেন্টিমিটার করে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিজ্ঞান জাদুঘর, মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান সংগঠনগুলো এই উপলক্ষে নানা আয়োজন করে।
আন্তর্জাতিক চাঁদ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে কৌতূহল, অধ্যবসায় এবং বিজ্ঞানের শক্তি মানুষকে অসম্ভবকেও সম্ভব করতে সাহায্য করে। একসময় চাঁদে মানুষের পা রাখা ছিল কল্পনার বিষয়। আজ সেটি ইতিহাস।
বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ আবারও চাঁদে মানুষ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভবিষ্যতে চাঁদে স্থায়ী গবেষণা কেন্দ্র গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাই আন্তর্জাতিক চাঁদ দিবস শুধু অতীতের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য স্মরণ করার দিন নয়, বরং ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের স্বপ্ন দেখারও একটি দিন।
.png)





