নদী খনন ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ—প্রকল্প থেকে সিস্টেমে রূপান্তরের অপরিহার্যতা

এশিয়া পোস্ট নিউজ
নদী খনন ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ—প্রকল্প থেকে সিস্টেমে রূপান্তরের অপরিহার্যতা
ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশকে ‘নদীমাতৃক দেশ’ বলা হয়—এটি কেবল একটি রূপক নয়, বরং একটি কঠিন বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার সক্রিয় ডেল্টা অঞ্চলে অবস্থিত এই দেশে নদীগুলো প্রতিনিয়ত ভূমি সৃষ্টি করে, আবার ভাঙনের মাধ্যমে তা বিলীনও করে। এই দ্বৈত প্রক্রিয়াই বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে একদিকে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে, অন্যদিকে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

এই প্রেক্ষাপটে ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ একটি যুগান্তকারী ও দূরদর্শী নীতিগত উদ্যোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো ২১০০ সালের মধ্যে একটি ‘নিরাপদ, জলবায়ু-সহনশীল এবং সমৃদ্ধ ডেল্টা’ গঠন করা। এখানে পানি, ভূমি, কৃষি, পরিবহন এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিতভাবে একীভূত করার কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনার অন্যতম ভিত্তি হলো ‘অ্যাডাপটিভ ডেল্টা ম্যানেজমেন্ট’—অর্থাৎ পরিবর্তনশীল নদীপ্রবাহ ও জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি গতিশীল ও অভিযোজন যোগ্য নীতিমালা গড়ে তোলা। কিন্তু এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার বাস্তব প্রয়োজনীয়তা বোঝার জন্য বাংলাদেশের নদী বাস্তবতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা জরুরি।

বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২.৪ বিলিয়ন টন পলি নদীপথে প্রবাহিত হয়, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ। এই বিপুল পলি নদীর তলদেশে জমা হয়ে নাব্যতা কমিয়ে দেয়, নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে এবং বন্যার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। এর ফলে দেশের প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথের মধ্যে শুষ্ক মৌসুমে কার্যকর থাকে মাত্র ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটার। অর্থাৎ, বাংলাদেশ তার সবচেয়ে সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থার একটি বড় অংশ কার্যত হারাচ্ছে।

অন্যদিকে, নদীভাঙন বাংলাদেশের একটি দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট। প্রতি বছর আনুমানিক ১০ লাখ মানুষ নদীভাঙনের শিকার হয়। এটি কেবল জমি হারানোর ঘটনা নয়; বরং একটি বৃহৎ সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়। ভাঙনকবলিত মানুষ প্রায়শই শহরের প্রান্তিক এলাকায় আশ্রয় নেয়, যেখানে তাদের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়াটি ‘জলবায়ু-প্রণোদিত অভিবাসন’ হিসেবে পরিচিত, যা ভবিষ্যতে নগরায়ণ, দারিদ্র্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

শিষ্টাচারের সংকট ও সভ্য জাতি গঠনের পথরেখা

বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতিও নদী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রতি বছর গড়ে দেশের প্রায় ২০-২৫ শতাংশ এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়, এবং চরম পরিস্থিতিতে তা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। নদীর নাব্য কমে গেলে বন্যার পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে না, ফলে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এই বাস্তবতায় নদী খনন (ড্রেজিং) একটি গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই খনন কার্যক্রম কি স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে? বাস্তবে দেখা যায়, বাংলাদেশে নদী খনন এখনো মূলত প্রকল্পভিত্তিক। একটি নির্দিষ্ট নদী খনন করা হয়, কিছু সময়ের জন্য নাব্যতা ফিরে আসে, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই আবার পলি জমে যায়। ফলে ‘খনন–পলি জমা–পুনঃখনন’—এই চক্রটি একটি ব্যয়বহুল কিন্তু অস্থায়ী সমাধানে পরিণত হয়েছে। এখানেই মূল সমস্যা স্পষ্ট হয়—নদীকে এখনও একটি সমন্বিত সিস্টেম হিসেবে দেখা হয় না।

বাংলাদেশে নদী ব্যবস্থাপনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রেক্ষাপট। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার নদী খননকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, কিন্তু এটি কখনোই একটি ধারাবাহিক, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নীতিতে রূপ নিতে পারেনি। অতীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের সময় নদী খননকে প্রধানত নৌপরিবহন উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কার্যকারিতা বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তববাদী হলেও সীমাবদ্ধ ছিল, কারণ এতে নদীর প্রাকৃতিক পলি-গতিবিদ্যা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের দীর্ঘমেয়াদি বিষয়গুলো যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই খনন কার্যক্রম স্বল্পমেয়াদি সুফল দিয়েছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হয়ে ওঠেনি। তবে এই সীমাবদ্ধতা কোনো একক রাজনৈতিক দলের নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা। এখানে নদী ব্যবস্থাপনাকে প্রকল্প হিসেবে দেখা হয়েছে, সিস্টেম হিসেবে নয়।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। নেদারল্যান্ডস নদী ব্যবস্থাপনায় ‘রুম ফর দ্য রিভার’ নীতির মাধ্যমে একটি মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। তারা নদীকে সংকুচিত না করে বরং তার জন্য অতিরিক্ত স্থান সৃষ্টি করেছে। এর ফলে বন্যা ঝুঁকি হ্রাস পেয়েছে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। এখানে নদী খনন একটি সহায়ক উপাদান, মূল সমাধান নয়। চীন নদী ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর একটি মডেল অনুসরণ করছে।

বৃহৎ আকারের ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি তারা সেডিমেন্ট মডেলিং, বাঁধ ব্যবস্থাপনা এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবহার করছে। ফলে নদীর আচরণ পূর্বাভাস যোগ্য হয়েছে এবং ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র একটি সমন্বিত ও ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি অনুসরণ করে, যেখানে ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি জলাভূমি পুনরুদ্ধার, বন্যাপ্রবাহ ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং ইকোসিস্টেম সংরক্ষণ সমান গুরুত্ব পায়। অর্থাৎ নদীকে একটি বহুমাত্রিক, জীবন্ত সিস্টেম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই উদাহরণগুলো একটি সাধারণ সত্য তুলে ধরে—নদী ব্যবস্থাপনা কখনোই একক সমাধানের ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি একটি সমন্বিত, ডেটাভিত্তিক এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ এই দিকেই নির্দেশনা দেয়। তবে বাস্তবায়নে এখনো একটি বড় ফাঁক রয়ে গেছে। নদী খনন এখনও অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে পরিচালিত হয়, যেখানে অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং পূর্ণাঙ্গ পলি ব্যবস্থাপনা কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-কে কাগজ থেকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। এর জন্য প্রয়োজন একটি মৌলিক নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর।

প্রথমত, নদী খননকে প্রকল্প নয়, বরং একটি ধারাবাহিক ‘সিস্টেম ফাংশন’ হিসেবে দেখতে হবে। এটি এককালীন কার্যক্রম নয়; বরং নদীর স্বাভাবিক গতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত একটি চলমান প্রক্রিয়া।

দ্বিতীয়ত, একটি জাতীয় পলি ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। পলি কোথা থেকে আসে, কোথায় জমা হয় এবং কীভাবে তা অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা যায়—এই সম্পূর্ণ চক্রটি বোঝা ও ব্যবস্থাপনা করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। স্যাটেলাইট মনিটরিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক হাইড্রোলজিক্যাল পূর্বাভাস এবং ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহারের মাধ্যমে নদী ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক করা সম্ভব।

চতুর্থত, খননকৃত পলিকে একটি মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এটি ভূমি পুনরুদ্ধার, উপকূল সুরক্ষা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

পঞ্চমত, আঞ্চলিক সহযোগিতা অপরিহার্য। গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র–মেঘনা অববাহিকা একটি আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থা, তাই উজানের দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।

সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক ঐকমত্য। নদী ব্যবস্থাপনা কোনো একক সরকারের প্রকল্প নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অঙ্গীকার। এখানে সব রাজনৈতিক শক্তির জন্য একটি সমন্বিত ও যৌথ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা অপরিহার্য। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তার নদীগুলোর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। নদীকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা নয়, বরং তার সঙ্গে সহাবস্থান করার একটি বৈজ্ঞানিক, সমন্বিত এবং টেকসই পদ্ধতি গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি। ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ সেই পথ দেখায়—কিন্তু বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে আমরা কত দ্রুত ‘প্রকল্প’ থেকে ‘সিস্টেম’-এ রূপান্তর ঘটাতে পারি তার ওপর।

লেখক: অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টি টেকনোলজি, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।