ফ্রান্সের অন্ধকার গলিতে হারিয়ে যাওয়া এক যুবকের গল্প

সাইফুল ইসলাম রনি
ফ্রান্সের অন্ধকার গলিতে হারিয়ে যাওয়া এক যুবকের গল্প
ফ্রান্সের একটি ব্রিজের নিচে আশ্রয় নেওয়া অভিবাসীদের তাঁবু। ছবি: সংগৃহীত

বিদেশ মানেই স্বপ্ন। একটি সুন্দর ভবিষ্যত, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো এবং জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে হাজারো তরুণের মতো দেশ ছেড়েছিলেন সুমন। বাবা-মায়ের অনেক আশা, সদ্য গড়া সংসার, এক বছরের মাথায় জন্ম নেওয়া ছোট্ট কন্যাসন্তান ও বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন ফ্রান্সে। কিন্তু সব স্বপ্ন কি পূরণ হয়?

Advertisement

ফ্রান্সে পৌঁছানোর পর অন্য অনেকের মতো সুমনও রাজনৈতিক আশ্রয়ের (অ্যাসাইলাম) আবেদন করেন। কিন্তু ভাগ্য তার সহায় হয়নি। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। সেই প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়েই শুরু হয় তার জীবনের দীর্ঘ সংগ্রাম, ব্যর্থতা ও হতাশার অধ্যায়।

বৈধ কাগজপত্র না থাকায় কাজ পাওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন। অথচ দেশে থাকা স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের জন্য নিয়মিত অর্থ পাঠানো জরুরি। অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ এবং ভবিষ্যতের অন্ধকার তাকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে তুলতে থাকে।

এই সময়ই কিছু মানুষের সংস্পর্শে এসে প্রথমে বন্ধুদের সঙ্গে পার্টিতে মাদক সেবন শুরু করেন তিনি। শখ থেকে শুরু হওয়া সেই পথ একসময় তাকে টেনে নিয়ে যায় মাদকের অন্ধকার জগতে।

জীবন বাঁচানোর তাগিদে এক পর্যায়ে একটি চক্র তাকে ট্রেন ও মেট্রোস্টেশনে অবৈধ সিগারেট বিক্রির কাজে যুক্ত করে। শুরুতে অন্যের হয়ে কাজ করলেও পরে দ্রুত লাভের আশায় নিজেই জড়িয়ে পড়েন অবৈধ কারবারে। কিছুদিন হয়তো আর্থিক স্বস্তি এসেছিল, কিন্তু সেই স্বস্তি ছিল মরীচিকার মতো।

মাদকসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন সুমন। এরপর শুরু হয় জেল আর মুক্ত জীবনের এক অন্তহীন চক্র। বছরের বড় একটি সময় কেটেছে কারাগারে, আবার মুক্তি পেয়ে ফিরে গেছেন একই কাজে। এভাবেই একের পর এক বছর পেরিয়ে যায়।

এদিকে দেশে অপেক্ষা করতে থাকে তার পরিবার। ছোট্ট মেয়েটি বড় হতে থাকে বাবাকে ছাড়া। স্কুলে যাওয়া শুরু করে। সহপাঠীরা জানে, তার বাবা ফ্রান্সে থাকেন। কিন্তু বাবার সঙ্গে তার দেখা হয় না বছরের পর বছর। স্ত্রী অপেক্ষা করেন স্বামীর জন্য। বৃদ্ধ বাবা-মা পথ চেয়ে থাকেন আদরের সন্তানের প্রত্যাবর্তনের আশায়।

অপেক্ষার সেই প্রহর শেষ হয়নি। বরং আরও দীর্ঘ হয়েছে। নয় বছরের এই প্রবাসজীবনে হতাশা আর অনিশ্চিত জীবন নিয়ে সুমন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে ছিলেন। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে বুঝিয়ে দেয় কতটা মূল্য দিতে হয়েছে ভুল সিদ্ধান্তের জন্য।

তিনি একবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দেশে ফিরে যাবেন, বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানকে দেখবেন। কিন্তু এর মধ্যেই গত দুই মাস হলো তার বাবা পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। বাবার শেষ মুখটিও দেখা হয়নি তার।

বাবার মৃত্যুর পর আবার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন তিনি। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে থেকে যান বিদেশের মাটিতে। হয়তো বাবারা এমনই হন। নিজের কষ্ট, নিজের ইচ্ছা, নিজের স্বপ্ন সবকিছু বিসর্জন দিয়েও সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভাবেন।

সম্প্রতি প্যারিসের একটি রাস্তায় তার সঙ্গে দেখা হয়। তখনও তিনি দাঁড়িয়ে অবৈধ সিগারেট বিক্রি করছিলেন। পরিচিত একজনের মাধ্যমে কথা হয় তার সঙ্গে। কাছের একটি দোকানে বসে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি নিজের জীবনের গল্প শোনান। সেই গল্পে ছিল ব্যর্থতা, অনুশোচনা, বেদনা এবং হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের দীর্ঘ ইতিহাস।

তার মুখে শোনা যায় প্যারিসে বসবাসরত কিছু বাংলাদেশির অন্ধকার জগতের নানা অজানা বাস্তবতার কথাও। তার গল্প শুনে বারবার মনে হয়েছে, একজন স্বপ্নবান যুবক কত আশা নিয়ে দেশ ছাড়ে। কিন্তু সবার ভাগ্যে কি সেই স্বপ্ন পূরণ হয়?

সুমনের গল্প শুধু একজন মানুষের গল্প নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা। হতাশা, অনিশ্চয়তা কিংবা আর্থিক সংকট কখনও মাদকের পথে যাওয়ার অজুহাত হতে পারে না। মাদক সাময়িকভাবে কিছু সমস্যাকে আড়াল করলেও শেষ পর্যন্ত তা মানুষকে পরিবার, সমাজ, ভবিষ্যত এবং নিজের অস্তিত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

বিদেশে বা দেশে, যে কোনো পরিস্থিতিতেই বৈধ পথ, ধৈর্য এবং সৎ পরিশ্রমই হতে পারে টেকসই সমাধান। সুমনের জীবনের হারিয়ে যাওয়া নয় বছর হয়তো আর কখনও ফিরে আসবে না। আর এভাবে কত বছর থাকতে হবে তার জানা নেই।