পড়ে আছে ২১১ কোটির পিসিআর ল্যাব, চালুর উদ্যোগ নেই

করোনা মহামারির সময় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ও সরকারি বরাদ্দে দেশে ১৬২টি আরটি-পিসিআর ল্যাব বসানো হয়। এগুলো স্থাপনে খরচ হয় প্রায় ২১১ কোটি টাকা। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির উন্নতি এবং প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এগুলোর বেশির ভাগই এখন অকেজো।
সরকারি কাগজপত্রে ২৩টি ল্যাব সচল দেখানো হলেও বাস্তবে অধিকাংশই বন্ধ। কোথাও কোথাও আবার ল্যাব থেকে চুরি হয়ে গেছে মূল্যবান যন্ত্রপাতি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পিসিআর ল্যাব শুধু করোনাভাইরাস নয়, ডেঙ্গু ও হেপাটাইটিসসহ অন্তত ২৫ ধরনের সংক্রমণ শনাক্তে ব্যবহারযোগ্য। কিন্তু যথাযথ তদারকি ও সদিচ্ছার অভাবে এসব স্বাস্থ্য অবকাঠামো দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
এসব ল্যাব চালুর বিষয়ে সরকারের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের কর্মকর্তাদের তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সরকার এই মুহূর্তে অগ্রাধিকারভিত্তিতে ৩৫টি প্রকল্পে গুরুত্ব দিচ্ছে। আরটি-পিসিআর ল্যাবগুলো নিয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে কতগুলো অচল ও সচল আছে মাঠপর্যায়ের তথ্য নিয়ে এগুলোকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় চিন্তা করা হবে।’
২০২০ সালে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। নির্ভুল তথ্য ও পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে ওই বছরই সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে ১৬২টি আরটি-পিসিআর (রিভার্স ট্রান্সক্রিপশন পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন টেস্ট) ল্যাব স্থাপন শুরু হয়। বিশ্বব্যাংকের অনুদান ও সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ‘কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যান্ডেমিক প্রিপায়ার্ডনেস প্রকল্পে’র আওতায় এগুলো স্থাপন করা হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়। একদিকে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি, অন্যদিকে প্রকল্প শেষে নিয়মিত জনবল না দেওয়ায় একে একে বন্ধ হয়ে যায় ল্যাবগুলো।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, গত বছরের মে মাসে সরকারি হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়। এজন্য ২৩টি ল্যাবে পরীক্ষা চালু করা হয়। তবে এগুলোর বেশির ভাগই এখন অচল অবস্থায় পড়ে আছে। বাকি ১৪১টি ল্যাব বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার কারণে অকার্যকর।
গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২৮ জুলাই পর্যন্ত দেশে করোনার ১৬ হাজার ৩৭৮টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এর মধ্যে করোনা শনাক্ত হয়েছে ৭৪১ জনের। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৩২ জনের।
২০২০ সালের ৮ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট ২০ লাখ ৫২ হাজার ২৮৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ২৯ হাজার ৫৩১ জনের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের সময়ে করা আরটি-পিসিআর ল্যাবের বিষয়ে সরকার এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুরোনো প্রকল্পের কোনোকিছুই বাতিল করা হয়নি, বরং প্রয়োজনীয় সবগুলোই সচল রাখার উদ্যোগ নিচ্ছে। এসব ল্যাব নিয়ে কী সিদ্ধান্ত হয় আমার অজানা। তবে খোঁজ নেব।’
অচল ল্যাবে চুরি হচ্ছে যন্ত্রপাতি
সরকারি কাগজে সচল দেখানো ২৩টি আরটি-পিসিআর ল্যাবের একটি কুষ্টিয়ার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে। ২০২০ সালের ৯ মে দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ল্যাবটি স্থাপন করা হয়। কিন্তু ইআরপিপি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পাওয়া জনবল প্রত্যাহারের পর গত বছরের জানুয়ারি থেকে ল্যাবের পুরো কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
পড়ে থাকা এই ল্যাবে গত বছরের এপ্রিলে চুরির ঘটনা ঘটে। সরেজমিনে দেখা যায়, ল্যাবের পেছনের জানালার গ্রিল কাটা। খোয়া গেছে একটি পিসিআর যন্ত্র, একটি মনিটর, একটি পিসিআর ডেস্কটপ, একটি এসির ইনডোর অংশ ও ছয়টি আউটডোর অংশ। এগুলোর আনুমানিক মূল্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা।
কাগজে সচল, বাস্তবে অচল
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের আরটি-পিসিআর ল্যাব চালু দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ে গিয়ে তা বন্ধ পাওয়া গেছে। কলেজটির মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধীনে ২০২০ সালের মে মাসে ল্যাবটি চালু হয়েছিল।
গণপূর্ত বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে ল্যাব স্থাপনের জন্য অবকাঠামোগত সংস্কার ও মেরামতে প্রায় ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। পিসিআর মেশিন ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সরকারের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে সরাসরি সরবরাহ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে ল্যাবটি অচল পড়ে আছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘কোভিড না থাকায় আমরা আর রিএজেন্ট নিচ্ছি না। টেস্টের জন্যও কেউ আসছে না। ফলে এটি বন্ধ আছে। তবে দরকার হলে পরিষ্কার করে রিএজেন্ট সংগ্রহ করে আবারও পরিচালনা করা যাবে।’
একই চিত্র বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও চাঁদপুর মেডিকেল কলেজে।
শুধু ঢাকার বাইরে নয়, রাজধানীর কুর্মিটোলা মাল্টিকেয়ার স্পেশালাইজড হাসপাতালের আরটি-পিসিআর ল্যাবও অন্তত ছয় মাস ধরে বন্ধ বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. নীহার রঞ্জন নন্দী। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘কোভিড কমার সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর প্রয়োজনীয়তা কমে যায়। অন্তত ছয় মাস ধরে এগুলো বন্ধ রয়েছে। কখনও সংক্রমণ বাড়লে হয়তো আবারও কাজে লাগানো যাবে। এগুলো নিয়ে এই মুহূর্তে আমাদের কোনো চিন্তা নেই।’
সীমিত পরিসরে চালু কয়েকটি
করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর বেসরকারি ও সরকারি উদ্যোগে দুটি আরটি-পিসিআর ল্যাব স্থাপন করা হয় রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে। বেসরকারি ল্যাবে করোনা পরীক্ষা হলেও সরকারি ল্যাবটি এখন পর্যন্ত করোনা শনাক্তে ব্যবহৃত হয়নি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, বেসরকারি উদ্যোগে ২০২০ সালের মে মাসে সেখানে করোনা পরীক্ষার জন্য পিসিআর ল্যাব স্থাপন করা হয়। এটির বাজারমূল্য ছিল ৭৭ লাখ টাকা। তবে বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
ইআরপিপি প্রকল্পের আওতায় একই বছর রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন আরেকটি পিসিআর ল্যাব স্থাপন করা হয়। ২০২২ সালের শুরুতে এটি চালু হলেও এখানে কখনও করোনা পরীক্ষা হয়নি। তবে মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ মাইক্রোবায়োলজিসহ বিভিন্ন পরীক্ষার কাজে ল্যাবটি ব্যবহার করছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে থাকা দুটি ল্যাবই সচল রয়েছে। একটি শিক্ষার্থীদের জন্য যক্ষ্মা (টিবি) নির্ণয় এবং হেপাটাইটিস বি বা সি-এর মতো সংক্রামক রোগ শনাক্তে ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যটি দিয়ে মাঝে মাঝে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পাঠানো সন্দেহভাজন রোগীদের করোনা পরীক্ষা করা হয়।
২০২০ সালের ১ এপ্রিল রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগে আনুষ্ঠানিকভাবে আরটি-পিসিআর ল্যাব চালু হয়। বর্তমানে ১০০ টাকা ফি জমা দিয়ে সেখানে করোনা পরীক্ষা করানো যায়।
সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের উপপরিচালক ওয়াদুদ বলেন, ‘শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ল্যাবটি চালু রয়েছে। বর্তমানে ৩০ থেকে ৪০টির মতো টেস্ট করা হচ্ছে।’
সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. প্রেমানন্দ দাস বলেন, ‘এ মেডিকেলে করোনা টেস্টের জন্য পিসিআর মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে করোনা না থাকায় এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে কলেজের মাইক্রোবায়োলজি ও ভাইরোলজি বিভাগের ল্যাবরেটরিতে পিসিআর মেশিন বসানো হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণাকাজে এটি ব্যবহার হচ্ছে।’
থমকে আছে নতুন উদ্যোগ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অচল ল্যাব সচল করতে নতুন একটি প্রকল্প হাতে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল স্বাস্থ্য বিভাগের। তৎকালীন স্বাস্থ্যসচিব মো. সাইদুর রহমান জানিয়েছিলেন, ‘জনবল নিয়োগ, কিট ও রিএজেন্ট কেনার উদ্যোগ নেবে সরকার। এজন্য সরকারের অর্থায়নে একটি প্রকল্প চালু থাকবে। এটি হলেই ল্যাবগুলো চালু করা যাবে।’
সরকার পরিবর্তনের পর এই উদ্যোগ থেকে সরে আসেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে প্রকৃতপক্ষে কতটি ল্যাব সচল এবং কতটিতে রিএজেন্ট নেই, তারও কোনো তথ্য নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এগুলোর সর্বশেষ অবস্থা আমার জানা নেই। অধিদপ্তর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবে। কীভাবে এগুলোকে কাজে লাগানো যায়, মাঠপর্যায়ে তথ্য পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান: বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রাঙামাটি, রংপুর ও সিলেট প্রতিনিধি
.png)

