ইতিহাস গড়া ম্যাচে মেসির যত রেকর্ড

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
ইতিহাস গড়া ম্যাচে মেসির যত রেকর্ড
লিওনেল মেসি। ছবি: সংগৃহীত

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি লিওনেল মেসির জন্য শুরু হয়েছিল হতাশায়, শেষ হলো ইতিহাসে। নবম মিনিটে পেনাল্টি মিস করেছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। কিন্তু এরপর ৩৮ মিনিটে গোল করে মিরোস্লাভ ক্লোসেকে ছাড়িয়ে পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের একক সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। যোগ করা সময়ে আরেক গোল করে নারী-পুরুষ মিলিয়ে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও নিজের করে নেন তিনি।

Advertisement

আর্জেন্টিনা জেতে ২-০ গোলে। দুই ম্যাচে ৬ পয়েন্ট নিয়ে শেষ ৩২ নিশ্চিত করে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। আর মেসির নামে যোগ হয় একাধিক রেকর্ড।

পুরুষদের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে প্রথম গোলেই পুরুষদের বিশ্বকাপে মেসির গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৭। তাতেই তিনি জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসেকে ছাড়িয়ে পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে একক সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। ক্লোসের গোল ছিল ১৬টি।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে ক্লোসের পাশে উঠে এসেছিলেন মেসি। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে প্রথম গোল করে সেই রেকর্ড এককভাবে নিজের করে নেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

নারী-পুরুষ মিলিয়ে বিশ্বকাপের নতুন চূড়া

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ৩৮ মিনিটের গোলটি শুধু ক্লোসেকে ছাড়ানোর গোল ছিল না। সেটি মেসিকে ব্রাজিলের নারী ফুটবল কিংবদন্তি মার্তার পাশেও তুলে দেয়। বিশ্বকাপে মার্তার গোল ১৭টি।

কিন্তু মেসি সেখানেই থামেননি। যোগ করা সময়ে নিজের দ্বিতীয় গোল করে বিশ্বকাপে গোলসংখ্যা নিয়ে যান ১৮-তে। তাতেই নারী-পুরুষ মিলিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসে এককভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যান তিনি।

দুই ম্যাচে ৫ গোল

২০২৬ বিশ্বকাপে মেসির শুরুটা অবিশ্বাস্য। প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক। দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল। দুই ম্যাচেই আর্জেন্টিনার সব গোল এসেছে মেসির পা থেকে।

দুই ম্যাচে তার গোল এখন ৫টি। বয়স প্রায় ৩৯ ছুঁইছুঁই, তবু বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ে শুরুতেই নিজেকে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছেন তিনি।

ছয় বিশ্বকাপের দীর্ঘ যাত্রা

মেসি বিশ্বকাপে খেলছেন ২০০৬ সাল থেকে। এরপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬—ছয়টি আসরেই তার উপস্থিতি। দীর্ঘ এই যাত্রায় তিনি শুধু টিকে থাকেননি, প্রতিটি যুগে নিজের প্রভাব রেখেছেন।

তবে এখানে একটি বিষয় আলাদা করে বলা জরুরি। মেসি ছয়টি বিশ্বকাপ খেললেও সব আসরে গোল করেননি। ২০১০ বিশ্বকাপে তাঁর গোল ছিল না। তাই তাঁর রেকর্ডটি ‘ছয় বিশ্বকাপে গোল’ নয়; বরং ছয় বিশ্বকাপজুড়ে দীর্ঘায়ু, প্রভাব এবং শীর্ষ পর্যায়ে টিকে থাকার এক বিরল উদাহরণ।

২০২২ সালে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন অধিনায়ক হিসেবে। ২০২৬ সালে এসে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও নিজের করে নিলেন। দীর্ঘায়ু, ধারাবাহিকতা এবং বড় ম্যাচে প্রভাব—তিনটি জায়গাতেই এই কীর্তি মেসিকে আলাদা করে দেয়।

টানা ছয় বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গোল করে বিশ্বকাপে টানা ছয় ম্যাচে গোলের ধারাও ধরে রাখলেন মেসি। ২০২২ বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব থেকে ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব পর্যন্ত নিয়মিত গোল করে চলেছেন তিনি।

এই ধারাবাহিকতা দেখায়, মেসির গোল শুধু বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত নয়। বিশ্বকাপের সবচেয়ে চাপের মঞ্চে তিনি বারবার ম্যাচের ভাগ্য বদলাচ্ছেন। টানা ছয় বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার কীর্তি তাঁকে আরও বিরল তালিকায় নিয়ে গেছে।

পেনাল্টি মিসের অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডও

ইতিহাসের রাতেও মেসির নামে যোগ হয়েছে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিসংখ্যান। নবম মিনিটে ভিডিও সহকারী রেফারির সিদ্ধান্তে পাওয়া পেনাল্টি থেকে গোল করতে পারেননি তিনি। থেমে থেমে নেওয়া দৌড়ের পর তাঁর বাঁ পায়ের শট বাইরে চলে যায়।

এর আগে ২০১৮ বিশ্বকাপে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করেছিলেন মেসি। ২০২২ বিশ্বকাপে পোল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেন ভয়চেখ শচেসনি। এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও মিস। ফলে তিনটি আলাদা বিশ্বকাপ আসরে নির্ধারিত সময়ে পেনাল্টি মিসের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও যোগ হলো তাঁর নামে।

বিশ্বকাপের মূল ম্যাচে মেসি এখন পর্যন্ত সাতটি পেনাল্টি নিয়েছেন, এর মধ্যে তিনটি মিস করেছেন। এত বড় ক্যারিয়ারের মধ্যেও পেনাল্টি যেন তাঁর রেকর্ড বইয়ের অস্বস্তিকর একটি অধ্যায় হয়ে থাকল।

পেনাল্টি মিসের পরই ইতিহাস

মেসির রাতটা বিশেষ হয়েছে এই বৈপরীত্যের কারণেও। পেনাল্টি থেকে গোল করতে পারলে রেকর্ডটা আগেই হয়ে যেত। কিন্তু সেই সুযোগ হারানোর পরও তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েননি।

৩৮ মিনিটে ফাকুন্দো মেদিনার নিচু ক্রস থেকে প্রথম ছোঁয়ায় বাঁ পায়ের ফিনিশিংয়ে গোল করেন তিনি। এই গোলেই ক্লোসেকে ছাড়িয়ে যান। অর্থাৎ যে ম্যাচ শুরু হয়েছিল ব্যর্থতায়, সেটিই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম ঐতিহাসিক রাত।

আর্জেন্টিনাকে শেষ ৩২-এ তোলার গোল

মেসির জোড়া গোল শুধু ব্যক্তিগত রেকর্ড নয়, দলীয় অর্জনও এনে দিয়েছে। অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনা দুই ম্যাচে ৬ পয়েন্টে উঠেছে এবং শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ জয়ের পর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও জয়। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা গ্রুপ ‘জে’-তে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। আর দুই ম্যাচেই সেই নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রে মেসি।

আর্জেন্টিনার সব গোলেই মেসি

২০২৬ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনার ৫টি গোল, সবই মেসির। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল। দলের আক্রমণ এখনো অনেকটাই তার ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু সেই নির্ভরতার জবাবও তিনি দিচ্ছেন।

এটি হয়তো মেসির সবচেয়ে বড় রেকর্ডগুলোর একটি নয়, কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তাগুলোর একটি। বয়স বাড়লেও আর্জেন্টিনার বড় মুহূর্তে তিনি এখনো প্রথম নাম।

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি মেসির ক্যারিয়ারের অদ্ভুত সারাংশ হয়ে থাকল। পেনাল্টি মিস আছে, ব্যর্থতার মুহূর্ত আছে, চাপ আছে। কিন্তু তার পরও আছে জবাব, গোল, রেকর্ড, জয় এবং নকআউট নিশ্চিত করা।