মেসিকে নিয়ে বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না স্কালোনি

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
মেসিকে নিয়ে বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না স্কালোনি
লিওনেল স্কালোনি। ছবি: সংগৃহীত

অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা। আর ম্যাচ শেষে লিওনেল স্কালোনির কথায় ছিল স্বস্তি, সতর্কতা এবং লিওনেল মেসির প্রতি নতুন মুগ্ধতা। ডালাসে গ্রুপ ‘জে’-এর ম্যাচে মেসির জোড়া গোলে অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। দুই ম্যাচে ৬ পয়েন্ট নিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই নকআউট পর্বে উঠে গেছে আর্জেন্টিনা।

Advertisement

ম্যাচটি আর্জেন্টিনার জন্য সহজ ছিল না। শুরুতেই পেনাল্টি পেয়েও গোল করতে পারেননি মেসি। নবম মিনিটে ভিডিও সহকারী রেফারির সাহায্যে দেওয়া পেনাল্টি থেকে তার শট লক্ষ্যে থাকেনি। কিন্তু ৩৮ মিনিটে ফাকুন্দো মেদিনার নিচু ক্রস থেকে গোল করে মিরোস্লাভ ক্লোসেকে ছাড়িয়ে পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের একক সর্বোচ্চ গোলদাতা হন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। যোগ করা সময়ে আরেক গোল করে নারী-পুরুষ মিলিয়ে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও নিজের করে নেন তিনি। বিশ্বকাপে মেসির গোল এখন ১৮।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে স্কালোনি অস্ট্রিয়ার কঠিন পরীক্ষার কথাই আগে বলেন। তার মতে, আর্জেন্টিনা জিতলেও ম্যাচটি সহজ ছিল না। স্কালোনি বলেন, ‘আলজেরিয়া ম্যাচের মতোই ছিল এটি। প্রতিপক্ষের মানসম্পন্ন খেলোয়াড় আছে, তারা ম্যাচ কঠিন করে তোলে এবং শারীরিকভাবে ভালো অবস্থায় আছে। কিছু বিষয় ঠিক করতে হবে, তবে জিতলে সবকিছু সহজ হয়ে যায়।’

আর্জেন্টিনা প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়েছিল। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও জিতেছে, তবে ম্যাচের অনেকটা সময় রালফ রাংনিকের দল হাই প্রেস ও শারীরিক ফুটবল দিয়ে আর্জেন্টিনাকে অস্বস্তিতে রেখেছিল। বিশেষ করে মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেস, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও রদ্রিগো দে পলকে সহজে সময় দিচ্ছিল না তারা।

তবে অস্ট্রিয়ার চাপকে পুরোপুরি গোলের সুযোগে রূপ নিতে দেখেননি স্কালোনি। তিনি বলেন, ‘প্রতিপক্ষ যখন আমাদের জন্য ম্যাচ কঠিন করার চেষ্টা করেছে, তখন সেই আধিপত্য কতটা গোলের সুযোগে পরিণত হয়েছে, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই।’

স্কালোনির এই মন্তব্যে ম্যাচের বাস্তব ছবিটাই ফুটে ওঠে। অস্ট্রিয়া সংগঠিত ছিল, আর্জেন্টিনার আক্রমণ গড়ে ওঠার পথ ভাঙার চেষ্টা করেছে, কিন্তু এমিলিয়ানো মার্তিনেসকে খুব বেশি বড় পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি। দ্বিতীয়ার্ধে মার্সেল সাবিৎজারের একটি প্রচেষ্টা ঠেকানো ছাড়া আর্জেন্টিনা গোলরক্ষকের রাত তুলনামূলক শান্তই ছিল।

তবু আর্জেন্টিনা কোচ স্বীকার করেছেন, তাঁর দলকে কিছু সময় ভুগতে হয়েছে। স্কালোনি বলেন, ‘যখন ভুগতে হয়, এই দল ভোগে। আজও কিছু সময়ে আমরা ভুগেছি, এমনকি তারা আমাদের খুব বিপদে না ফেললেও।’

এই কথাটিই আর্জেন্টিনার বর্তমান পরিচয়ের সঙ্গে মেলে। তারা শুধু আক্রমণ করে জেতে না, চাপ সামলেও জেতে। ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে এই দল বারবার দেখিয়েছে, ম্যাচের কঠিন সময়েও নিজেদের ভেঙে পড়তে দেয় না। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও সেটাই দেখা গেল। পেনাল্টি মিসের পর চাপ বাড়তে পারত, কিন্তু মেসির গোল ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনে।

শেষ ৩২ নিশ্চিত হওয়ায় স্কালোনি খুশি, তবে তিনি মনে করিয়ে দিলেন, পথ সহজ ছিল না। তাঁর ভাষায়, ‘মানুষ দলটিকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়, দেখে কীভাবে দল প্রতিযোগিতা করে, কীভাবে উপভোগ করে। আমরা খুশি। মনে হচ্ছিল সহজ হবে, কিন্তু সহজ ছিল না। আপনারা দুই ম্যাচই দেখেছেন।’

স্কালোনির এই মন্তব্যে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের আবেগের কথাও আছে। কাতারে বিশ্বজয়ের পরও দলটির প্রতি মানুষের বিশ্বাস কমেনি। বরং মেসির শেষ দিকের বিশ্বকাপ যাত্রা, তরুণদের সঙ্গে অভিজ্ঞদের মিশ্রণ, আর স্কালোনির স্থিরতা—সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনা আবারও বড় স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

তবে শিরোপার প্রশ্নে আর্জেন্টিনা কোচ সতর্ক। তাঁর মতে, বিশ্বকাপ জয়ের লড়াইয়ে শুধু আর্জেন্টিনা নয়, আরও অনেক দল আছে। স্কালোনি বলেন, ‘বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে পারে এমন অনেক দল আছে এবং তারা সবাই লড়বে। বড় দলগুলোর কয়েকটি জিতবে, আমরাও লড়াইয়ে থাকব, কিন্তু সবার জন্যই কঠিন হবে।’

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় গল্প অবশ্য মেসি। নবম মিনিটে পেনাল্টি মিসের পরও তিনি ম্যাচের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন। প্রথম গোলে ক্লোসেকে ছাড়িয়ে যান, দ্বিতীয় গোলে রেকর্ডটা আরও বাড়ান। দুই ম্যাচে তাঁর গোল এখন ৫টি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের পর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল। চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সব গোলই এসেছে তাঁর পা থেকে।

মেসিকে নিয়ে স্কালোনির প্রশংসাও ছিল গভীর। তিনি বলেন, ‘লিও যখন ছন্দে আসে, সবাই ছন্দে আসে। আর এর কৃতিত্ব দলেরও। দল যখন ভুগছিল, তখনও সে পরিশ্রম করেছে, গোলের আগে বল কেড়েছে, নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছে। সে যা তৈরি করে, তা অবিশ্বাস্য।’

স্কালোনির চোখে মেসির সবচেয়ে বড় দিক শুধু গোল নয়, তাঁর সম্পৃক্ততা। ম্যাচের কঠিন সময়ে তিনি নিচে নেমেছেন, বল নিয়েছেন, চাপ তৈরিতে অংশ নিয়েছেন, আবার সঠিক সময়ে বক্সে ঢুকে গোল করেছেন। ৩৮ মিনিটের গোলটি ছিল সেই ফুটবল-বুদ্ধিরই উদাহরণ। মেদিনার নিচু ক্রসের আগে তিনি জায়গা বুঝে নেন, তারপর প্রথম ছোঁয়ায় বাঁ পায়ের নিখুঁত ফিনিশিং।

মেসিকে নিয়ে আর কী বলবেন, সেটিই যেন খুঁজে পাচ্ছিলেন না স্কালোনি। আর্জেন্টিনা কোচ বলেন, ‘আমি জানি না ওকে নিয়ে আর কী বলব। আর জানি না, যা বলছি সেটাও যথেষ্ট কি না।’

মেসির ক্ষেত্রে এমন অসহায় প্রশংসা নতুন নয়, কিন্তু অস্ট্রিয়ার রাত সেটিকে আরও অর্থবহ করেছে। কারণ এই ম্যাচে একই সঙ্গে ছিল ব্যর্থতা ও মহিমা। প্রথমে পেনাল্টি মিস, পরে ইতিহাস গড়া গোল, শেষে আরেক গোল। মেসি আবারও দেখালেন, ভুল করলেও ম্যাচের শেষ কথা তিনি লিখতে পারেন।