আল–জাজিরার প্রতিবেদন/ট্রাম্প শিবিরে ফাটল, ভ্যান্স-রুবিওর পথ বেঁকেছে দুই দিকে

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ট্রাম্প শিবিরে ফাটল, ভ্যান্স-রুবিওর পথ বেঁকেছে দুই দিকে
বাঁয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ডানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং মাঝে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করার পর তোপের মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশেষ করে ইসরায়েলপন্থী রাজনীতিক ও সমর্থকেরা এর কড়া সমালোচনা করছেন। এই পরিস্থিতিতে কয়েক মাসের যুদ্ধের ইতি টানতে হওয়া ওই চুক্তির পক্ষে সাফাই গাইতে প্রচারণায় নেমেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।

Advertisement

ভ্যান্স একে ‘ভালো অগ্রগতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত চুক্তির জন্য একটি ‘খুব ভালো ভিত্তি’ তৈরি হয়েছে।

দুই পক্ষ চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে এখন ৬০ দিন সময় পাবে। সুইজারল্যান্ডে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ভ্যান্স। সমঝোতা স্মারকের বিরোধিতা করায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তিনি বেশ কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন।

ইসরায়েলের সামরিক শক্তি ব্যবহারের কৌশল নিয়ে ভ্যান্স বলেন, ‘আপনারা ৯০ লাখ মানুষের একটি দেশ। সব জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যা কেবল হত্যার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়।’

ভ্যান্সের ঠিক উল্টো পথে হেঁটেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের প্রকাশ্য সমালোচনা এড়িয়ে গেছেন। এর পরিবর্তে তিনি ইরান সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন।

গত সপ্তাহে রুবিও মধ্যপ্রাচ্য সফর করেন। সেখানে তিনি ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় মিত্রদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। যুদ্ধের সময় তেহরানের হামলার মুখে পড়েছিল এই মিত্ররা।

২৫ জুন বাহরাইনে রুবিও ঘোষণা করেন, ‘হরমুজ প্রণালির মতো আন্তর্জাতিক জলপথ কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের মালিকানাধীন নয়।’

এর কয়েক দিন পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরের ওপর পাল্টা হামলা শুরু করে। ১৭ জুন সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর এই প্রথম তিন দিন ধরে এমন সংঘাত চলল।

বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই অস্থিরতা তৈরি হয়। তবে উত্তেজনা প্রশমনে দুই পক্ষ এখন কারিগরি আলোচনায় বসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গত এক সপ্তাহে ভ্যান্স ও রুবিওর বক্তব্যে আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন সুর পাওয়া গেছে। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে মতভেদের গুঞ্জন শুরু হয়েছে।

তবে হোয়াইট হাউস কঠোরভাবে এই গুঞ্জন প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা জানিয়েছে, এই দুই কর্মকর্তার মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই।

এই বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে ভ্যান্স ও রুবিওর বক্তব্যের খুঁটিনাটি খতিয়ে দেখা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কোথায় পার্থক্য রয়েছে এবং এর গুরুত্বই বা কতটুকু, তা এখানে তুলে ধরা হলো।

ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনে কি ফাটল ধরেছে?

গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে হওয়া চুক্তির পক্ষে কথা বলতে ভ্যান্স ও রুবিও দুজনকেই বিদেশ সফরে পাঠানো হয়। এই সফরকালে গণমাধ্যমে দেওয়া তাঁদের বক্তব্যে সামান্য ভিন্নতা লক্ষ্য করা গেছে।

ইসরায়েল প্রসঙ্গে

গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে দেওয়া এক বক্তব্যে জেডি ভ্যান্স ইঙ্গিত দেন যে, বৈরুতের বেসামরিক স্থাপনায় ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এমনকি খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও বেসামরিক ভবনে হামলার জন্য ইসরায়েলের সমালোচনা করেছেন। ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘কাউকে খোঁজার জন্য প্রতিবার একটি পুরো অ্যাপার্টমেন্ট ভেঙে ফেলার দরকার নেই। ওই ভবনগুলোতে অনেক মানুষ থাকে এবং তারা সবাই হিজবুল্লাহ নয়।’ লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় ৪ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

ভ্যান্স সরাসরি ইসরায়েলকে ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা বন্ধ করতে বলেছেন। চলতি মাসের শুরুতে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে সারা বিশ্বে ডোনাল্ড ট্রাম্পই একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি ইসরায়েল সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকলে, বিশ্বের হাতেগোনা শক্তিশালী মিত্রদের একজনকে অন্তত আক্রমণ করতাম না।’ গাজায় গণহত্যা এবং ইরান যুদ্ধের কারণে ইসরায়েল যখন বিশ্বজুড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, তখনই ভ্যান্সের এই কড়া মন্তব্য এলো।

অন্যদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পক্ষ নিয়েছেন। তিনি বারবার এই হামলাকে হিজবুল্লাহর আক্রমণের ‘যৌক্তিক জবাব’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ভ্যান্সের সমালোচনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে রুবিও সরাসরি উত্তর না দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান। উল্টো তিনি হিজবুল্লাহর একটি হামলার উদাহরণ টেনে ইসরায়েলের পক্ষ সমর্থন করেন।

উপসাগরীয় দেশগুলো প্রসঙ্গে

ভ্যান্স ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য সুইজারল্যান্ড সফর করেছেন। গত রোববার সাংবাদিকদের কাছে তিনি ইরান নিয়ে বেশ আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন যে, আরব দেশগুলো চাইলে ইরানের পুনর্গঠন তহবিলে অর্থায়ন করতে পারে।

এদিকে, মার্কো রুবিও সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং বাহরাইন সফর করেছেন। এই দেশগুলোর কেউ কেউ মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি তেহরানকে অনেক বেশি সুবিধা দিচ্ছে। রুবিও মিত্র দেশগুলোকে আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, ওয়াশিংটন সব সময় তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে।

২৩ জুন রুবিও জানান, তিনি তাঁর সফরে উপসাগরীয় মিত্রদের কাছে ইরানের পুনর্গঠনের জন্য কোনো তহবিল চাইবেন না। তাঁর মতে, এমন সম্ভাবনা এখনো অনেক পরের কথা। দুই দিন পর আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো চুক্তি হতে হবে নিশ্ছিদ্র। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষা করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা চুক্তি চাই, তবে যেকোনো মূল্যে নয়।’

ইরান প্রসঙ্গে

ইরান নিয়ে ভ্যান্স প্রায়ই একটি নতুন ও সহযোগিতামূলক সম্পর্কের সম্ভাবনার কথা বলেন। তিনি মনে করেন, দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শান্তি ও সমৃদ্ধি বাড়াতে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। ভ্যান্স ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার আগের অবস্থান থেকেও সরে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘আপনি ইসরায়েল বা ইরান—কাউকেই বলতে পারেন না যে তাদের আত্মরক্ষার কোনো অধিকার নেই।’ অন্যদিকে রুবিও ইরানের প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। ২৪ জুন তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ইরানকে কোনো টোল বা ফি আদায় করতে দেওয়া হবে না।

বিভক্তির গুঞ্জনে হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া

প্রশাসনের ভেতরে বিভক্তির খবর অস্বীকার করেছে হোয়াইট হাউস। মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, ‘এখানে একটাই পক্ষ, আর তা হলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পক্ষ। ইরান যাতে কোনোদিন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সে লক্ষ্যে পুরো প্রশাসন প্রেসিডেন্টের পেছনে ঐক্যবদ্ধ আছে।’ পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট একে একটি ‘পুরানো ও মিথ্যা’ প্রচারণা বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, পুরো প্রশাসন প্রেসিডেন্টের নির্দেশনায় একইভাবে কাজ করছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, লেবানন ইস্যুতেও দুই কর্মকর্তার মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই বলে দাবি করেছে পররাষ্ট্র দপ্তর। প্রশাসনের লক্ষ্য হলো পুরো ভূখণ্ডে লেবানন সরকারের সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনা। রুবিও নিজেও ভ্যান্সের সঙ্গে মতবিরোধের কথা অস্বীকার করেছেন। গত বৃহস্পতিবার এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিনি ও ভ্যান্স দুজনেই ট্রাম্পের নেতৃত্ব অনুসরণ করছেন। রুবিও বলেন, ‘এখানে সবাই প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত।’

এই বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ভ্যান্স ও রুবিও ট্রাম্প প্রশাসনের দুই শীর্ষ কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ঐতিহাসিকভাবেই পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। গত বছর দায়িত্ব নেওয়ার আগে ভ্যান্স প্রায়ই বিদেশি যুদ্ধকে জীবন ও অর্থের অপচয় বলে সমালোচনা করতেন। অন্যদিকে রুবিও সিনেটে একজন ‘কট্টরপন্থী’ (হক) হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তিনি ইরান, রাশিয়া ও কিউবার বিরুদ্ধে সংঘাতময় অবস্থানের পক্ষপাতী।

এই দুজনকে ট্রাম্পের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁরা রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে দুটি শক্তিশালী ও প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করছেন। একপক্ষে আছেন ‘নব্য রক্ষণশীলরা’ (নিওকন), যারা অন্য দেশে হস্তক্ষেপের পক্ষে কথা বলেন। অন্যপক্ষে আছেন সেই সব ভোটার ও নীতিনির্ধারকেরা যারা মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ের বিদেশি যুদ্ধগুলো ছিল ব্যয়বহুল ও হঠকারী।