আলবেনিয়ার ব্যবসায়ীর জমি কিনে প্রতারণার শিকার ট্রাম্পের জামাতা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার আলবেনিয়ায় জমি কিনে বড় ধরণের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এর ফলে কুশনারের কয়েক বিলিয়ন ডলারের একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট প্রকল্প আইনি জটিলতার মুখে পড়েছে। কুশনার যে ব্যবসায়ীর কাছ থেকে রিসোর্টের জন্য জমি কিনেছেন, সেই আর্তুর শেহুর বিরুদ্ধে জমির দলিল জালিয়াতির অভিযোগ এনছে আলবেনিয়ার অপরাধ দমন সংস্থা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হাতে আসা দেশটির স্পেশাল স্ট্রাকচার এগেইনস্ট করাপশন অ্যান্ড অর্গানাইজড ক্রাইম (এসপিএকে)-এর ২০০ পৃষ্ঠার এক মামলার নথিতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। মিয়ামিভিত্তিক এই ব্যবসায়ী আলবেনিয়ায় মাদকের অর্থ পাচারের অভিযোগে পলাতক আসামি।
তবে এই জালিয়াতির মামলায় জ্যারেড কুশনার, তার বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প সাজান রিয়েল এস্টেট বা অন্য কোনো মার্কিন বিনিয়োগকারীর বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়নি। জমি কেনার সময় ট্রাম্পের জামাতা বা অন্য বিনিয়োগকারীরা শেহুর এই অপরাধ সম্পর্কে জানতেন এমন কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
সাজান রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা জমি অধিগ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াটিকে বৈধ বলে বিশ্বাস করে এবং যেকোনো আইনি তদন্তে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
তদন্তকারী সংস্থার মামলার নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে, আর্তুর শেহু এবং তার সহযোগীরা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইউরোপের বিভিন্ন বন্দরে কোকেন পাচারের সঙ্গে জড়িত। এই অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জিত বিপুল অর্থ বৈধ করতে তারা একটি বিশাল আবাসন সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। এ জন্য তারা জালিয়াতির মাধ্যমে জমির ভুয়া মালিকানা দলিল তৈরি করেন।
গত এপ্রিলে শেহু আলবেনিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলের এই পুরনো জমি কুশনারের সাজান রিয়েল এস্টেট ডেভেলপমেন্ট এবং অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আলবেনিয়া ল্যান্ড ডেভেলপমেন্টের কাছে বিক্রি করেন। এই জমি কেনাবেচায় প্রায় ১১০ মিলিয়ন ইউরো লেনদেন হয়।
আইনজীবীরা নথিতে স্পষ্ট করে লিখেছেন, পর্যাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে এই সম্পদগুলো জাল দলিলের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে বলে জোর সন্দেহ রয়েছে। ইতোমধ্যে আলবেনিয়ার নোটারির অ্যাকাউন্টে এই বিক্রয়লব্ধ বিপুল অর্থ অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে তদন্ত সংস্থা, যাতে তা শেহুর হাতে পৌঁছাতে না পারে।
প্রকল্পের আওতাধীন জুভেরনেক গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই জমির মালিকানা নিয়ে শেহুর বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালাচ্ছেন। স্থানীয়রা করের রেকর্ড ও পুরনো দলিল দেখিয়ে দাবি করেছেন, তারাই এই জমির প্রকৃত মালিক। তাদের আইনজীবী কোস্টানডিন বেকো জানান, রিসোর্ট প্রকল্পটি স্থগিত করার জন্য তারা দ্রুতই আদালতের দ্বারস্থ হবেন।
অন্যদিকে, আলবেনিয়ার অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের এই উপকূলীয় অঞ্চলটি বন্য সৈকত, অরণ্য এবং সামুদ্রিক কচ্ছপ ও ফ্ল্যামিংগো পাখিদের এক অনন্য প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা আবাসস্থল। পরিবেশবাদীরা এই মেগা প্রকল্পের কারণে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কা করে ‘ফ্ল্যামিংগো বিপ্লব’ নামে ব্যাপক আন্দোলন শুরু করেছেন।
কুশনারের স্ত্রী ইভানকা ট্রাম্প জানান, কয়েক বছর আগে ইয়ট থেকে এই অপরূপ সুন্দর উপকূল দেখে তারা এখানে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, ভিলা ও ইয়ট জেটিসহ রিসোর্ট তৈরির পরিকল্পনা করেন।
আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এডি রামা এই প্রকল্পটিকে দেশের পর্যটন শিল্পের জন্য অত্যন্ত সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ আখ্যা দিয়ে জানিয়েছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিক্ষোভ সত্ত্বেও এটি যথাসময়ে বাস্তবায়িত হবে বলে জানান তিনি। সরকারের এক মুখপাত্র রয়টার্সকে জানান, এটি ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক লেনদেন হওয়ায় সরকার এতে হস্তক্ষেপ করবে না, তবে পুরো প্রকল্প ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও আলবেনিয়ার আইন মেনে চলছে।
গত ১২ জুন প্রস্তুত করা এসপিএকে-এর নথির ভিত্তিতে ইতোমধ্যে মাদক পাচার ও অর্থ পাচারের অভিযোগে আলবেনিয়ায় ২০ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, প্রকাশ্যে শুধু নামের আদ্যক্ষর ব্যবহার করা হলেও মামলার নথির সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ‘এ. এসএইচ’ আদ্যক্ষরের ব্যক্তিটি আর্তুর শেহু।
অবশ্য শেহুর আইনজীবী কুজতিম সাক্রানি তার মক্কেলের বিরুদ্ধে আনা মাদক পাচার ও দলিল জালিয়াতির সব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তিনি আরও জানান, শেহুর পরিবার অটোমান সাম্রাজ্যের আমল থেকে এই জমির মালিক এবং ১৯৯৮ সালে অপরাধী চক্রের হাতে পরিবার পরিজন হারিয়ে শেহু প্রাণভয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছিলেন। মার্কিন বিচার বিভাগ এই বিষয়ে আলবেনিয়ার কোনো আইনি অনুরোধ পেয়েছে কিনা তা এখনও স্পষ্ট করেনি।




