Advertisement

ভারতে আলোচিত যত মন্ত্রীর পদত্যাগ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ভারতে আলোচিত যত মন্ত্রীর পদত্যাগ
ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

ভারতের বহুল আলোচিত মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে তুমুল ছাত্রআন্দোলনের মুখে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। তিনি বলেন, চলতি বছরের ৩ মে নিট পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই তিনি এর দায়ভার স্বীকার করেছিলেন।

শনিবার (২৫ জুলাই) আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।

মূলত প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার দাবিতে আন্দোলনে নতুন গতি আসে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের ২৬ দিনের অনশন শুরুর পর। কংগ্রেস, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও সিজেপি শুরু থেকেই ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি হিসেবে তুলে ধরে।

ক্রমবর্ধমান জনচাপ ও রাজনৈতিক চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এই ঘটনাকে ঘিরে ভারতে সরকার ও মন্ত্রীদের জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। পাশাপাশি, শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, পরীক্ষা পরিচালনার নিরাপত্তা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

ভারতের মন্ত্রীপরিষদ থেকে পদত্যাগ করা ব্যক্তিতের মধ্যে ধর্মেন্দ্র প্রধানই প্রথম নন। এর আগেও প্রায় ডজন খানেক মন্ত্রী তাদের দায়িত্বরত পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তাদের কেউ কেউ নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অকপটে স্বীকার করেছেন, কেউ কেউ আবার রাজনৈতিক অস্থিরতা ও চাপের কথা বিবেচনা করেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।

লাল বাহাদুর শাস্ত্রী

ভারতে রাজনৈতিক জবাবদিহিতার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ তৈরি হয় ১৯৫৬ সালে। সেসময় কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ছিলেন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। তামিলনাড়ুর আরিয়ালুরে এক ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় ১৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হলে তিনি এর নৈতিক দায় স্বীকার করে ১৯৫৬ সালের ২৫ নভেম্বর রেলমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু প্রথমে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর পদত্যাগ গ্রহণ করতে চাননি। তবে শাস্ত্রী নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন। তিনি যুক্তি দেন, দুর্ঘটনার জন্য মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে নৈতিক দায় তারই। শেষ পর্যন্ত নেহরু তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন।

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ঘটনা আজও মন্ত্রীদের নৈতিক জবাবদিহিতার অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

টিটি কৃষ্ণমাচারী

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে জবাবদিহিতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ টি. টি. কৃষ্ণমাচারির পদত্যাগ। জীবন বীমা করপোরেশনের (এলআইসি) অর্থ শিল্পপতি হরিদাস মুন্দ্রার প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট মুন্দ্রা কেলেঙ্কারির জেরে তিনি ১৯৫৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

পরে ১৯৬৩ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি আবার অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তবে ১৯৬৫ সালে তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি তদন্তের জন্য ভারতের প্রধান বিচারপতিকে অনানুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব দেন। তদন্ত শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে নৈতিক দায় স্বীকার করে কৃষ্ণমাচারি আবারও অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান।

ভিকে কৃষ্ণ মেনন

১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের শুরুতে ভারতের সামরিক বিপর্যয় ও ব্যাপক জনসমালোচনার মুখে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভি. কে. কৃষ্ণ মেনন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ১৯৬২ সালের ৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন।

পদত্যাগের পর তার হাতে শুধু প্রতিরক্ষা উৎপাদন–সংক্রান্ত দায়িত্ব রাখা হয়। পদত্যাগের মাধ্যমে তিনি চীন-ভারত যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহগুলোতে দেশের উল্লেখযোগ্য সামরিক অপ্রস্তুতি এবং বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে নিজের ভূমিকার কথা স্বীকার করে নেন।

ভিপি সিং

১৯৮৭ সালে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, বিশেষ করে সাবমেরিন ক্রয়সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে কমিশন নেওয়ার অভিযোগের তদন্তকে কেন্দ্র করে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভি. পি. সিং পদত্যাগ করেন। এই পদক্ষেপ ভারতের রাজনীতিতে জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

পরে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। তবে তার নেতৃত্বাধীন সংখ্যালঘু জোট সরকার লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে ১৯৯০ সালের ৭ নভেম্বর তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকেও পদত্যাগ করেন।

মাধবরাও সিন্ধিয়া

কংগ্রেস নেতা মাধবরাও সিন্ধিয়া তার রাজনৈতিক জীবনে দুবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন।

প্রথমবার তিনি ১৯৯৩ সালের জানুয়ারিতে বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী থাকাকালে পদত্যাগ করেন। একটি ভাড়া করা রুশ টিইউ-১৫৪ বিমানের দুর্ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানির পর তিনি এর নৈতিক দায় স্বীকার করে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন।

দ্বিতীয়বার তিনি ১৯৯৬ সালের জানুয়ারিতে মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। সে সময় বহুল আলোচিত হাওয়ালা দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে তার নাম জড়িয়ে পড়ায় তিনি মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ান।

নীতীশ কুমার

১৯৯৯ সালের আগস্টে পশ্চিমবঙ্গের গাইসাল ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রায় ২৯০ জন নিহত হওয়ার পর তৎকালীন রেলমন্ত্রী নীতীশ কুমার নৈতিক দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেন।

অবধ-আসাম এক্সপ্রেস ও ব্রহ্মপুত্র মেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরে তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়।

বড় ধরনের রেল দুর্ঘটনার দায় স্বীকার করে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা মন্ত্রীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।

শিবরাজ পাটিল

২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতার নৈতিক দায় স্বীকার করে তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিবরাজ পাতিল পদত্যাগ করেন।

এর আগে একই বছরের সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে ধারাবাহিক বোমা হামলার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও সংবাদমাধ্যমের সামনে উপস্থিত হওয়ার সময় তিনি একাধিকবার পোশাক পরিবর্তন করেছিলেন। সেই দৃশ্য টেলিভিশন ও অন্যান্য গণমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয় এবং তার জনমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পরবর্তীতে ২৬/১১ মুম্বাই হামলার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের ব্যর্থতার দায় নিয়ে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান।

এ. রাজা

২জি স্পেকট্রাম বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০১০ সালে তৎকালীন যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী এ. রাজা পদত্যাগ করেন। সে সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন।

অভিযোগের পর রাজনৈতিক চাপ ও তদন্তের মুখে তিনি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিলেও শুরু থেকেই সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসেন।

এ. রাজার দাবি ছিল, তিনি নতুন কোনো নীতি প্রয়োগ করেননি; বরং আগের জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) সরকারের প্রণীত নীতিমালাই অনুসরণ করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।

দয়ানিধি মারান

এয়ারসেল-ম্যাক্সিস চুক্তি–সংক্রান্ত অভিযোগের জেরে ২০১১ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী দয়ানিধি মারান পদত্যাগ করেন।

সিবিআই সুপ্রিম কোর্টে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগমন্ত্রী থাকাকালে তিনি টেলিকম উদ্যোক্তা সি. শিবশঙ্করনকে তার প্রতিষ্ঠান এয়ারসেলের অংশীদারিত্ব মালয়েশিয়াভিত্তিক ম্যাক্সিস গ্রুপের কাছে বিক্রি করতে চাপ দিয়েছিলেন।

এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপ ও তদন্তের মুখে মারান কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ান। তবে তিনি শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে আসেন।

পবন কুমার বনসাল

রেলওয়ে বোর্ডে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর ২০১৩ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী পবন কুমার বানসাল পদত্যাগ করেন।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, তার ভাগ্নে বিজয় সিংলা রেলওয়ে বোর্ডের এক সদস্যকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদোন্নতির সুবিধা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ঘুষ গ্রহণ করেছিলেন। অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসার পর ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

যদিও বানসালের বিরুদ্ধে সরাসরি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, তবু রাজনৈতিক চাপ ও সরকারের ভাবমূর্তির কথা বিবেচনা করে তিনি রেলমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান।

অশ্বিনী কুমার

কয়লা ব্লক বরাদ্দ-সংক্রান্ত বহুল আলোচিত ‘কোলগেট’ কেলেঙ্কারির তদন্তে সরকারের ভূমিকা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের তীব্র সমালোচনার পর ২০১৩ সালের মে মাসে তৎকালীন কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অশ্বিনী কুমার পদত্যাগ করেন।

অভিযোগ ছিল, তদন্ত-সংক্রান্ত সিবিআইয়ের স্ট্যাটাস রিপোর্ট প্রকাশের আগে আইন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তা পর্যালোচনা ও সংশোধনের চেষ্টা করা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট অসন্তোষ প্রকাশ করলে সরকার ব্যাপক চাপের মুখে পড়ে।

যদিও এই বিতর্ক কোনো একক ঘটনার ফল ছিল না, বরং আইনি ও রাজনৈতিক নানা জটিলতার সঙ্গে জড়িত ছিল। তবুও অশ্বিনী কুমারের পদত্যাগকে সরকারের জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

এমজে আকবর

যৌন হয়রানির অভিযোগের মুখে ২০১৮ সালের অক্টোবরে কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন এম. জে. আকবর।

সাংবাদিক প্রিয়া রামানি প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার পর আরও কয়েকজন নারী সাংবাদিক ও সাবেক সহকর্মী আকবরের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন। অভিযোগগুলো সামনে আসার পর দেশজুড়ে #MeToo আন্দোলন নতুন গতি পায়।

এরপর এম. জে. আকবর মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি জানান, প্রিয়া রামানির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত মানহানির মামলা লড়ার জন্যই তিনি পদত্যাগ করছেন। তবে শুরু থেকেই তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসেন।

সূত্র: দ্য হিন্দু