বর্ষায় নতুন রূপে রাঙামাটি, ভিড় জমাচ্ছেন পর্যটকরা

পাহাড় আর কাপ্তাই হ্রদের মিতালিতে গড়া পার্বত্য জেলা রাঙামাটি বর্ষার ছোঁয়ায় রূপ নিয়েছে এক অপরূপ সৌন্দর্যে। আষাঢ়-শ্রাবণের অঝোর ধারায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে শুকিয়ে যাওয়া ঝরনাগুলো। শুভলং, ধূপপানি ও মুপ্পাছড়ার মতো ঝরনাগুলোর গর্জনে মুখরিত এখন প্রকৃতির চারপাশ। প্রকৃতির এই মনমুগ্ধকর সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশজুড়ে দূর-দূরান্ত থেকে ভিড় জমাচ্ছেন পর্যটকরা।
বর্ষায় চঞ্চল পাহাড়ি ছড়া আর অবিরাম ধারায় বয়ে চলা শুভলং সহ ছোট-বড় ঝরনাগুলোর গর্জন প্রকৃতির বুকে এক নতুন সুর তুলে ধরেছে। রাঙামাটিতে বর্ষা নামতেই রূপকথার মতো বদলে গেছে সব প্রাকৃতিক দৃশ্যপট। কাপ্তাই হ্রদের বুক চিরে বোটে করে যাওয়ার সময় চারপাশের সবুজ পাহাড় আর মেঘের লুকোচুরি খেলা মন কাড়ছে দর্শনার্থীদের।
রাঙামাটি সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বিখ্যাত শুভলং ঝরনা। ভরা বর্ষায় মূল ঝরনার জলধারা প্রায় ৩০০ ফুট উঁচু থেকে সোজা নিচে আছড়ে পড়ে, যার সুরের মূর্ছনায় মুগ্ধ হন আসা পর্যটকরা। শহরের রিজার্ভ বাজার, পর্যটন ঘাট বা অন্যান্য স্থান থেকে স্পিডবোট ও ইঞ্জিনচালিত নৌযানে করে খুব সহজেই সুবলং যাওয়া যায়।
অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকদের কাছে পাহাড়ের গহিনে লুকিয়ে থাকা ধূপপানি ঝরনা সবসময়ই এক অনন্য আকর্ষণ। স্থানীয়দের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা ও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে প্রায় তিন ঘণ্টার পথ পাড়ি দিলেই দেখা মেলে এই ধূপপানি ঝরনার। ‘ধূপ’ শব্দের অর্থ সাদা। স্থানীয় জনশ্রুতি রয়েছে, এই ঝরনার ঠিক ওপরের গুহায় এক ধ্যানরত সাধু বাস করতেন।
শুভলংয়ের পাশাপাশি কাউখালীর ঘাগড়া ঝরনা, বিলাইছড়ির নকাটা ও মুপ্পাছড়া এবং ধূপপানি ঝরনার হিমশীতল পানিতে গা ভাসাচ্ছেন পর্যটকরা। ঝরনার পাশাপাশি ঝুলন্ত সেতু, পলওয়েল পার্ক এবং লাভ পয়েন্টেও এখন দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে।

রাঙামাটিতে পর্যটকদের আগমন বাড়ায় মুখে হাসির ঝিলিক ফুটেছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। গত কয়েক মাসের মন্দা ভাব ও আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর হোটেল-মোটেলগুলোতে বুকিং বেড়েছে বহুগুণ। একই সাথে কাপ্তাই হ্রদের বোটচালক থেকে শুরু করে স্থানীয় হস্তশিল্প ও পাহাড়ি খাবারের রেস্তোরাঁগুলোতেও বিকিকিনি বেড়েছে বহুলাংশে। বর্ষার এই ভরা মৌসুমে পর্যটকদের সমাগম বাড়ায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো জেলার স্থানীয় অর্থনীতিতে।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা পর্যটক দেবপ্রিয় ও নমিতা রায় দম্পতি বলেন, ভরা বর্ষায় এখন ঝরনাগুলোতে উপচে পড়া পানি। পরিবার নিয়ে একটু স্বস্তি পেতেই রাঙামাটিতে বেড়াতে আসা। বিশেষ করে শুভলং ঝরনার হিমশীতল জলে গা ভিজিয়ে ভীষণ ভালো লাগছে।
অন্য এক ভ্রমণার্থী অনিন্দ্য ও শারমিন দম্পতি তাদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, শহরের যান্ত্রিক কোলাহল থেকে দূরে এসে পাহাড়ি ঝরনার গান আর কাপ্তাই লেকের শান্ত জল আমাদের মুগ্ধ করেছে। বর্ষায় রাঙামাটির এই সতেজ ও স্নিগ্ধ রূপ সত্যিই অতুলনীয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মন্টু চাকমা জানান, ছুটির দিনগুলোতে প্রচুর পর্যটকের সমাগম ঘটে, তখন বেচাকেনাও বেশ ভালো হয়। মূলতঃ ঝরনাগুলোতে পানি বেশি থাকায় পর্যটকদের আকর্ষণ বেড়েছে। এতে আমাদের ব্যবসার গতিও ফিরছে।
পাহাড়ি হস্তশিল্পের ব্যবসায়ী মো. মাসুদ রানা বলেন, ফেব্রুয়ারির পর রাঙামাটিতে পর্যটকদের তেমন আনাগোনা ছিল না। তবে এখন বর্ষায় প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে ভালোই পর্যটক আসছেন। এভাবে পর্যটক আসা অব্যাহত থাকলে স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস পাবেন।
রাঙামাটি পর্যটন কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক অলোক বিকাশ চাকমা জানান, বর্ষায় কাপ্তাই হ্রদ পানিতে পূর্ণ হয়েছে এবং ঝরনাগুলো যৌবন ফিরে পাওয়ায় পর্যটকদের আগমন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ছুটির দিনগুলোতে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ রুমের বুকিং নিশ্চিত হচ্ছে। তাছাড়া দর্শনার্থীদের উৎসাহিত করতে শর্তসাপেক্ষে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
.png)






