ভাইরালের নেশায় বন্যহাতিকে উত্ত্যক্ত, বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকি

শাকিল মুরাদ, শেরপুর
ভাইরালের নেশায় বন্যহাতিকে উত্ত্যক্ত, বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকি
হাতি লোকালয়ে আসলেই ভিডিও বানান তথাকথিক কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

শেরপুরের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় খাবারের সন্ধানে চলাচল করা বন্যহাতির দল নতুন এক সংকটে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার নেশায় কিছু তথাকথিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও উৎসুক মানুষের উত্ত্যক্তে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে বন্যহাতি। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে মানুষ-হাতির সংঘাত, অন্যদিকে বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকিও।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে শেরপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় ৩৩টি বন্যহাতির মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাতি-মানুষ সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৪ জন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় প্রায়ই খাবারের সন্ধানে এক টিলা থেকে আরেক টিলায় চলাচল করে বন্যহাতির পাল। তবে, সম্প্রতি হাতির চলাচলের সময় কিছু ব্যক্তি তাদের অনুসরণ করে পটকা ফাটানো, ঢিল ছোড়া ও বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি বনভূমি দখল করে কৃষিজমি সম্প্রসারণের অভিযোগ রয়েছে। ফসল রক্ষার নামে অনেক জায়গায় বিদ্যুতের তার বসানো হচ্ছে। এতে প্রাণ হারাচ্ছে বন্যহাতি। এতে একদিকে জীববৈচিত্র্য যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সংঘাতও বাড়ছে।

হাতিকে তাড়া করে ভিডিও বানান তথাকথিক কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
হাতিকে তাড়া করে ভিডিও বানান তথাকথিক কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

শ্রীবরদী উপজেলার বালিজুড়ি এলাকার বাসিন্দা আলী হোসেন বলেন, ‘কিছু পোলাপান শুধু ভিডিও করার লাইগা হাতির পিছে পিছে আহে। হাত্তির বুঘল গিয়া পটকা ফাডায়, চিহের পাড়ে, ঢেল মারে। এইডা দেইখা হাতিগো ভয় লাগে, রাগও উঠে। তহন হাতি দৌড়ানি দেয়। আবার অনেক সময় হাতিও জঙ্গলে জায়গা।’

একই উপজেলার খারামোড়া এলাকার বাসিন্দা রহমত আলী বলেন, ‘হাতি এমনে এমনে কারও ক্ষতি করে না। কিন্তু মানুষ যখন বারবার বিরক্ত করে, তখন হাতিও খেইপা যায়। এইসব বন্ধ না করলে মানুষও মরব, হাতিও মরব। তাই সবাইরে সচেতন হইতে অইব।

ঝিনাইগাতীর ছোট গজনী এলাকার বাসিন্দা আব্দুল সোবহান বলেন, অনেকে ফসল বাঁচাতে বিদ্যুতের তার টানিয়ে রাখেন। এতে হাতি মারা যায়। বন রক্ষা করতে হলে হাতির চলাচলের পথও রক্ষা করতে হবে এবং মানুষকে আরও সচেতন করতে হবে।

শেরপুরে লোকালয়ে বন্যহাতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
শেরপুরে লোকালয়ে বন্যহাতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পরিবেশবাদী সংগঠন শাইন’র নির্বাহী পরিচালক মুগনিউর রহমান মনি বলেন, হাতি স্বভাবগতভাবে শান্ত প্রাণী। কিন্তু তাদের ভয় দেখানো, উত্ত্যক্ত করা এবং স্বাভাবিক চলাচলে বাধা দেওয়ার কারণেই তারা আক্রমণাত্মক আচরণ করে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে কঠোর নজরদারি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন। বনে কেন মানুষ থাকবে, বনে থাকবে বিভিন্ন বন্যপ্রাণী। কিন্তু সেটা না করে বনের মধ্যে মানুষ থাকছে, এজন্যই এমন ঘটনা ঘটছে। আর সম্প্রতি কিছু টিকটকার হাতির কাছে গিয়ে হাতিকে বিরক্ত করছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ময়মনসিংহ বন বিভাগের বালিজুড়ি রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সুমন মিয়া বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়মিত মাইকিং, প্রচারণা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি হাতির চলাচলের সময় স্থানীয়দের সতর্ক থাকতে বলা হচ্ছে।

শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, বন্যহাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য সরকারি ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে মানুষ ও হাতির সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

বিষয় :শেরপুর