রাঙামাটিতে আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়ছে মানুষ, ভেসে উঠছে ক্ষতচিহ্ন

রাঙামাটিতে বৃষ্টি কমে আসায় এবং বন্যার পানি নামতে শুরু করায় আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছে মানুষ। তবে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে পাহাড় ধস ও বন্যার প্রলয়ংকরী ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলায় এ পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
শনিবার (১১ জুলাই) সকাল থেকে জেলার সবচেয়ে বেশি প্লাবিত বাঘাইছড়ি উপজেলা ও বিলাইছড়ির ফারুয়া এলাকার বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে কাপ্তাই হ্রদের পানি বৃদ্ধির ফলে বরকল ও জুরাছড়ির কিছু নিম্নাঞ্চল নতুন করে প্লাবিত হওয়ায় সেখানকার সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত বাঘাইছড়ির স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পৌরসভার বাড়বিন্দু ঘাট এলাকায় কাপ্তাই হ্রদের শহররক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় এই ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ড ও ৮টি ইউনিয়নের প্রায় সব গ্রামের মানুষ এখনও পানিবন্দি। অনেক দুর্গম এলাকায় এখনও সরকারি ত্রাণ পৌঁছায়নি এবং সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা মাহজানা বলেন, গত দুই দিন বৃষ্টি না হওয়ায় মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে শুরু করেছে। বর্তমানে ২১টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৪৭১টি পরিবারের ১ হাজার ৯২৮ জন মানুষ অবস্থান করছেন। যারা ঘরে আটকা পড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে পারেননি, আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের কাছেও শুকনো ও রান্না করা খাবার পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি।
এদিকে পাহাড়ি ঢলে বরকল উপজেলার তিন শতাধিক ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলিজমি পানিতে তলিয়ে আছে। তীব্র স্রোতের কারণে কাপ্তাই হ্রদে নৌ চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া বাঘাইছড়িতে ভারী বর্ষণে সড়ক ধসে পড়ায় উপজেলার মূল সড়কের যোগাযোগ এখনও বিচ্ছিন্ন।

রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার বাঙ্গালহালিয়া ইউনিয়নে শুক্রবার দিবাগত রাতে আকস্মিক ঢলে তলিয়ে গেছে একটি খামারের দেড় হাজার ব্রয়লার মুরগি। ডাকবাংলা পাড়ার ‘সাদেক পোল্ট্রি ফার্ম’-এর তরুণ উদ্যোক্তা মো. সাদেক জানান, বিক্রিযোগ্য প্রতিটি মুরগির ওজন ছিল প্রায় ১ কেজি ২০০ গ্রাম। এই সপ্তাহেই এগুলো বিক্রি করার কথা ছিল। বন্যায় প্রায় ৫ লাখ টাকারও বেশি ক্ষতি হয়ে গেল তার।
রাঙামাটি মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান জানান, জেলার ২০টি ইউনিয়নের ৭৬টি পুকুর ও খামারের মাছ বন্যায় ভেসে গেছে। এতে প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি ধরা হয়েছে ১ কোটি ৭২ লাখ টাকা, যার বড় অংশই হয়েছে বাঘাইছড়িতে। অন্যদিকে জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় মোট ৩ হাজার ৪৯৫ হেক্টর ফসলিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৭১৭ হেক্টর আউশ ও আমনের বীজতলা ও ধানক্ষেত রয়েছে।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, ১০ উপজেলায় ১২৫টি স্থানে ধসের ঘটনা ঘটেছে। রাঙামাটি সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা বলেন, পাহাড়ধসে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছাড়াও বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কের বিভিন্ন অংশ ধসে গেছে। তবে আপৎকালীন জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করে আমরা আপাতত যান চলাচল স্বাভাবিক রেখেছি।
রাঙামাটি আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পুরো জেলায় বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ৩ হাজার ৭২৩ জন মানুষ অবস্থান করছেন এবং তাদের তিনবেলা খাবার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।





