চট্টগ্রামে পানিবন্দি সাড়ে চার লাখ মানুষ, ১১ জনের মৃত্যু

টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেনি। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ১৫ উপজেলায় পানিবন্দি হয়ে আছেন সাড়ে চার লাখ মানুষ। পাহাড় ধস, পানিতে ডুবে ও স্রোতে ভেসে গিয়ে ১১ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হয়েছে জেলা প্রশাসন। বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য জেলার সাত উপজেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
শনিবার (১১ জুলাই) সকাল থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কমে আসায় কিছু কিছু এলাকায় পানি ধীরগতিতে নামতে শুরু করেছে।
পানি পুরোপুরি নেমে না যাওয়ায় এবং স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থা সচল না হওয়া পর্যন্ত সংকট কাটার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দক্ষিণ চট্টগ্রামের যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বেশকিছু অংশ প্লাবিত হওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সাতকানিয়া-বান্দরবান সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কে।
সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর অধিকাংশ এলাকা গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে সম্পূর্ণ বিদ্যুৎহীন ছিল। মোবাইল টাওয়ারগুলো অচল হয়ে পড়ায় দুর্গত মানুষরা যোগাযোগ করতে পারছেন না, যা উদ্ধার অভিযানকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা স্পিডবোট ও লাইফ জ্যাকেট নিয়ে দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করছেন। উদ্ধার কাজ সুশৃঙ্খল করতে সেনাবাহিনী তিনটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছে। ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন। সম্প্রতি বাঁশখালীর চেচুরিয়া এলাকায় ঘরের ভেতর আটকে পড়া একটি অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুসহ ১৩ জনের একটি পরিবারকে ফায়ার সার্ভিস অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছেন।
সরকারিভাবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ৭০০ টন চাল ও ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবকদের মতে, দুর্গম এলাকা ও বিচ্ছিন্ন যোগাযোগের কারণে ভেতরের গ্রামগুলোতে এখনও পর্যাপ্ত শুকনা খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বাঁশখালী
গত ৬ জুলাই থেকে চট্টগ্রামে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয় লোহাগাড়া-বান্দরবান পার্বত্য অঞ্চল থেকে নেমে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢল। পানি জমে জেলার নিম্নাঞ্চলে ৮ জুলাই থেকে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় উপজেলা বাঁশখালী। সেখানে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে ছিল সাগরের জোয়ার।

উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার প্রায় দুই লাখের বেশি মানুষ বর্তমানে পানিবন্দি। পুকুরিয়া, নাপোড়া, ছনুয়া, সরল ও শেখেরখীল ইউনিয়নে দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। হঠাৎ পানি ঢুকে পড়ায় মাঠের ফসল, শাকসবজির বীজতলা এবং শত শত মাছের ঘের সম্পূর্ণ ভেসে গেছে।
বাঁশখালীর বৈলছড়ির বাসিন্দা মুজতাহিদ হাসান দুর্ভোগের কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের মাটির ঘরটা তিন পুরুষের সম্পদ। আমার দাদার জন্ম হয়েছিল এই ঘরে। ২০২৪ সালের বন্যায় এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দাঁড়িয়ে ছিল। তবে এবার আর টিকল না। গত বৃহস্পতিবার সকালে ঘরটা ভেঙে পড়ে। বাড়িতে দাদি, মা ও ভাই-বোন ছিল। আমি খবর শুনে চট্টগ্রাম থেকে আসি। টানা তিন দিন পানিবন্দি ছিলাম। আজ পানি নামতে শুরু করলেও রান্নার কোনো ব্যবস্থা নেই। বিদ্যুৎ আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টার জন্য মাঝে-মাঝে আসছে।’
বৃদ্ধা দাদিসহ পরিবারের ছয় সদস্যকে নিয়ে তিন দিন পানিবন্দি থাকা মুজতাহিদ কেন আশ্রয়কেন্দ্রে যাননি—এই প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘এই বাড়িটাই আমাদের শেষ সম্বল ছিল। বানের জলে বাড়ি ধসে পড়ল, বাকি সব রক্ষা করার একটা তাগিদ ছিল। তাছাড়া চারদিকে এত পানি ছিল যে বাড়ি থেকে বের হওয়া নিরাপদ ছিল না। হঠাৎ পাহাড়ি ঢলে রাস্তাঘাট সব ডুবে গিয়েছিল।’
বাঁশখালীর বেশির ভাগ মানুষের অবস্থা এখন মুজতাহিদের মতো। হঠাৎ আসা পাহাড়ি ঢলে ঘরবাড়ি ধসে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন তারা। এই পরিস্থিতি সম্পর্কে চট্টগ্রাম জজ কোর্টের আইনজীবী ওকাব উদ্দিন সাকিব বলেন, ‘এখানকার বেশির ভাগ মানুষের ঘর মাটির তৈরি। বলতে গেলে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ভাগ মাটির ঘর ভেঙে গেছে। পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্রও অপ্রতুল। তার ওপর হঠাৎ পাহাড়ি ঢলে চারদিক প্লাবিত হওয়ায় লোকজন সময়মতো আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারেনি।’
পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন শেখেরখীল ইউনিয়নের বাসিন্দা আইনজীবী কামাল পাশা। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে ঘরে পানি নেই। তবে রাস্তায় হাঁটু পানি আছে। বিলগুলো ডুবে আছে। এখানকার সবচেয়ে বড় সংকট হলো বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের অভাব। পাহাড়ি এলাকাগুলোতে সাহায্য সেভাবে পৌঁছাচ্ছে না।’
আইনজীবী ওকাব উদ্দিন সাকিব জানান, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাঁশখালীতে এই বিপর্যয়। বাঁশখালীর পূর্বে চুনতি অভয়ারণ্যের পাহাড় ও পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর। এই উপজেলাকে দুই ভাগে ভাগ করেছে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি প্রধান সড়ক। পাহাড়ের ঢলের পানি পূর্ব দিক থেকে এসেছে, আবার একই সময়ে সাগরের জোয়ারের পানি এসেছে পশ্চিম দিক থেকে। দুই দিক থেকে আসা পানির চাপে এই অবর্ণনীয় দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে।
বাঁশখালীর মতো একই পরিস্থিতি সাতকানিয়া উপজেলায়। পাহাড়ি ঢলের তীব্রতায় ডলু খালের বাঁধ ভেঙে হুহু করে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা বর্তমানে পানির নিচে। সাতকানিয়া পৌরসভা, বাজালিয়া ও ধেমশা ইউনিয়নে ৪ থেকে ৫ ফুট পর্যন্ত পানি থইথই করছে। এখানে প্রায় ৩ লাখ মানুষ ঘরের ছাদে বা খাটের ওপর মাচা তৈরি করে কোনোমতে দিন পার করছেন।

এ ছাড়া উত্তর ও মধ্য চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া ও বোয়ালখালী উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। হালদা ও শঙ্খ নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
১১ জনের মৃত্যু
চট্টগ্রাম জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ১১ জনের মৃত্যুর তথ্য আমাদের কাছে আছে। শনিবার কোনো নতুন মৃত্যুর খবর আমরা পাইনি। এই মুহূর্তে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া আর চন্দনাইশ এলাকায় মানুষ পানিবন্দি আছে। বাকি উপজেলাগুলো থেকে পানি নেমে গেছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বন্যায় মৃত ১১ জনের মধ্যে সাত শিশু রয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা পাহাড় ধস, পানিতে তলিয়ে ও স্রোতে ভেসে গিয়ে মারা গেছে। তাদের মধ্যে বাঁশখালীতে মৃত্যু হয়েছে তিন শিশুর।
এ ছাড়া সরল ইউনিয়নে রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় পা পিছলে পানির স্রোতে তলিয়ে যায় ১২ বছরের তাহিন নুর। বাহারছড়া ইউনিয়নে পানিতে ডুবে ১১ বছরের মোহাম্মদ আশিক ও ছয় বছরের মোহাম্মদ মিরাজ নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়।
গত ৯ জুলাই আনোয়ারার বরুমছড়া ইউনিয়নে বাড়ির পাশে বন্যার পানিতে খেলতে গিয়ে ডুবে মারা যায় ছয় বছরের মাদ্রাসা শিক্ষার্থী মো. ইশতিয়াক। এ ছাড়া চট্টগ্রাম নগরে পাহাড় ধসে দুই শিশু, সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে একজন এবং রাউজানে পানির স্রোতে ভেসে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
জেলার ১৫ উপজেলায় প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষ পানিবন্দি আছেন জানিয়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলা। উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সব উপজেলা প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিতে কাজ চলছে।





