ডিসি বাংলোর পেছনেই চুরি, আলোর অভাবে কিশোর গ্যাংয়ের দখলে করতোয়া ওয়াকওয়ে

অরুপ রতন, বগুড়া
ডিসি বাংলোর পেছনেই চুরি, আলোর অভাবে কিশোর গ্যাংয়ের দখলে করতোয়া ওয়াকওয়ে
লাইটের অভাবে অন্ধকারে রূপ নিয়েছে করতোয়া ওয়াকওয়ে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত করতোয়া নদীর দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে এখন অন্ধকারে নিমজ্জিত। সন্ধ্যা নামলেই যেখানে আলো ঝলমলে হওয়ার কথা ছিল পুরো নদীতীর, সেখানে এখন নিকষ কালো অন্ধকার। আর এই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ওয়াকওয়েটি পরিণত হয়েছে মাদকসেবী ও কিশোর গ্যাংয়ের নিরাপদ আশ্রয়ে। জেলা প্রশাসকের বাংলো, জেলা কারাগার ও স্টেশন ক্লাবের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার ঠিক পাশেই চলছে এই হরিলুট ও অপরাধের মহোৎসব।

ইতোমধ্যেই উধাও হয়ে গেছে দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ‘আই লাভ করতোয়া’ স্থাপনার ‘লাভ’ অংশটিও।

অন্ধকারে ঢাকা কোটি টাকার প্রকল্প

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জেলা কারাগারসংলগ্ন সেতু থেকে এসপি ব্রিজ পর্যন্ত ওয়াকওয়ের ৩৪টি সৌরবাতির মধ্যে ১২টিই সম্পূর্ণ অচল। খোদ জেলা প্রশাসকের বাংলোর সামনের ৬টি সৌরবাতির মধ্যে জ্বলছে মাত্র ১টি; বাকি ৫টিই নিভে আছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোলার লাইটের ভেতরে থাকা দামি ব্যাটারি, কন্ট্রোলারসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ একের পর এক চুরি হয়ে যাওয়ায় পুরো ব্যবস্থাটি অকেজো হয়ে পড়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—যেখানেই আলো নেই, সেখানেই সন্ধ্যার পর বসছে মাদকসেবীদের আড্ডা। ওয়াকওয়ের মাঝখানে তৈরি করা ছাতা আকৃতির দুটি চমৎকার বিশ্রামস্থল এখন পুরোদমে অপরাধীদের দখলে। হাঁটতে আসা নারী ও পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন সময় উত্ত্যক্ত করার ঘটনাও ঘটছে।

নিয়মিত হাঁটতে আসা এক দর্শনার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একসময় পরিবার নিয়ে নির্ভয়ে হাঁটতে আসতাম। এখন অন্ধকার অংশগুলো এড়িয়ে চলতে হয়। সন্ধ্যার পর অনেকেই মাদক সেবন করে। মেয়েদের বিরক্ত করার ঘটনাও দেখা যায়।

আতিকুর রহমান আরেক দর্শনার্থী বলেন, এভাবে চলতে থাকলে অল্প দিনের মধ্যে পুরো ওয়াকওয়ের লাইট, বেঞ্চ, টাইলস সব চুরি হয়ে যাবে। এখনই কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নিলে কোটি টাকার প্রকল্প ধ্বংস হতে বেশি সময় লাগবে না।

উধাও ‘আই লাভ করতোয়া’র ‘লাভ’

একসময় ছবি তোলার জন্য তরুণ-তরুণীদের পছন্দের জায়গা ছিল ‘আই লাভ করতোয়া’ সেলফি পয়েন্টটি। অথচ এখন সেখানে ‘লাভ’ অংশটিই নেই। চোরেরা সেটিও উপড়ে নিয়ে গেছে। পড়ে আছে শুধু লোহার কিছু ভাঙা কাঠামো। কয়েক মাস আগে চুরি হলেও সেটি পুনরায় স্থাপন বা চোর শনাক্তে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি প্রশাসন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, আমরা কাজ শেষ করে জেলা প্রশাসনের কাছে ওয়াকওয়েটি বুঝিয়ে দিয়েছি। এরপর থেকেই একের পর এক চুরি হচ্ছে। সোলার লাইটের যন্ত্রাংশ গেছে, ‘আই লাভ করতোয়া’র ‘লাভ’ গেছে। এখন শুধু স্টিলের পাইপ আর টাইলস চুরি হওয়া বাকি আছে। প্রশাসনের সবাই জানেন, কিন্তু কেউ কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, পুরো ওয়াকওয়ে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা, নিয়মিত পুলিশি টহল জোরদার এবং স্থায়ী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করা ছাড়া এই সম্পদ রক্ষা করা অসম্ভব।

এ বিষয়ে বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, সোলার লাইট না জ্বলার বিষয়টি তারা অবগত আছি। এটা একদিনে হয়নি। আমরা সেখানে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি। আমাদের নজরদারি রয়েছে, তবে এই সম্পদ রক্ষায় স্থানীয় সর্বসাধারণের সহযোগিতাও অত্যন্ত প্রয়োজন।

বিষয় :বগুড়া