লো ব্লাড প্রেসার নিয়ে যা জানা জরুরি

লো ব্লাড প্রেসার বা নিম্ন রক্তচাপ অনেক সময় কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে না। তবে রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে গেলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পায় না। এর ফলে মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কিংবা গুরুতর ক্ষেত্রে জীবনঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তাই লো ব্লাড প্রেসার সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
রক্ত আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছে দেয়। আর এই রক্ত যখন হৃদ্যন্ত্র থেকে পাম্প হয়ে ধমনির ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন ধমনির দেয়ালে একটি নির্দিষ্ট চাপ সৃষ্টি করে। এই চাপকেই বলা হয় রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেসার।
দিনজুড়ে নানা কারণে রক্তচাপ ওঠানামা করে।
ঘুম, হাঁটাচলা, ব্যায়াম, মানসিক চাপ কিংবা খাবার খাওয়ার মতো সাধারণ কাজেরও এর ওপর প্রভাব পড়ে। বেশির ভাগ সময় রক্তচাপ কিছুটা কম থাকলে সেটি চিন্তার বিষয় নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি সুস্থতার লক্ষণ। তবে রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে গেলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো পর্যাপ্ত রক্ত পায় না। তখন দেখা দিতে পারে নানা ধরনের সমস্যা।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় কম রক্তচাপকে বলা হয় হাইপোটেনশন।
লো ব্লাড প্রেসার কাকে বলে?
রক্তচাপ দুটি সংখ্যায় প্রকাশ করা হয়।
প্রথম সংখ্যা হলো সিস্টোলিক চাপ। এটি বোঝায় হৃদ্যন্ত্র সংকুচিত হয়ে রক্ত পাম্প করার সময় ধমনিতে কত চাপ তৈরি হচ্ছে।
দ্বিতীয় সংখ্যা হলো ডায়াস্টোলিক চাপ। এটি বোঝায় হৃদ্যন্ত্র বিশ্রামে থাকা অবস্থায় ধমনির চাপ কত।
স্বাভাবিক রক্তচাপ সাধারণত ১২০/৮০ মিলিমিটার মার্কারি (mmHg) বা এর কম হলে ভালো ধরা হয়। তবে রক্তচাপ যদি ৯০/৬০ মিলিমিটার মার্কারি (mmHg)- এর নিচে নেমে যায়, তখন তাকে লো ব্লাড প্রেসার বা হাইপোটেনশন বলা হয়।
তবে শুধু সংখ্যা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। কারও রক্তচাপ কম হলেও যদি কোনো সমস্যা না থাকে, তাহলে সেটি স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু রক্তচাপ কমে মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
লো ব্লাড প্রেসারের ধরন
সব ধরনের লো ব্লাড প্রেসারের কারণ এক নয়। কখন এবং কেন রক্তচাপ কমছে, তার ভিত্তিতে এটি কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়।
অরথোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন
বসে বা শুয়ে থাকার পর হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলে অনেকের মাথা ঝিমঝিম করে বা চোখে অন্ধকার দেখা দেয়। এটিই অরথোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। গর্ভাবস্থাতেও এটি হতে পারে।
এ ছাড়া পারকিনসন রোগ, ডায়াবেটিস বা স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যেও এ ধরনের লো ব্লাড প্রেসার বেশি দেখা যায়।
খাবার খাওয়ার পর রক্তচাপ কমে যাওয়া
কিছু মানুষের খাবার খাওয়ার পর রক্তচাপ কমে যায়। এটি বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি ও স্নায়ুতন্ত্রের নির্দিষ্ট সমস্যায় আক্রান্তদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
নিউরালি মেডিয়েটেড হাইপোটেনশন
হৃদ্যন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে সংকেত আদান-প্রদানে সাময়িক সমস্যা হলে এই ধরনের লো ব্লাড প্রেসার হতে পারে।
অনেকক্ষণ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা, হঠাৎ ভয় পাওয়া, মানসিক ধাক্কা খাওয়া বা অতিরিক্ত আবেগের কারণেও এটি দেখা দিতে পারে। শিশু ও কিশোরদের মধ্যে এ সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
শকের কারণে রক্তচাপ কমে যাওয়া
গুরুতর আঘাত, মারাত্মক সংক্রমণ বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে শরীর শকে চলে যেতে পারে। তখন রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমে যায়।
এটি একটি চিকিৎসা জরুরি অবস্থা। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে জীবনহানির ঝুঁকি থাকে।
কেন লো ব্লাড প্রেসার হয়?
দিনের বিভিন্ন সময়ে সাময়িকভাবে রক্তচাপ কমে যেতে পারে। এটি সব সময় রোগের লক্ষণ নয়।
তবে নিচের কারণগুলো দীর্ঘমেয়াদি লো ব্লাড প্রেসারের জন্য দায়ী হতে পারে।
- গর্ভাবস্থা
- হৃদ্রোগ বা হার্ট অ্যাটাক
- শরীরে পানিশূন্যতা
- অতিরিক্ত বমি বা ডায়রিয়া
- ডায়াবেটিস
- থাইরয়েডের সমস্যা
- অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির সমস্যা
- দীর্ঘদিন বিছানায় শুয়ে থাকা
- গুরুতর সংক্রমণ
- তীব্র অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া
- অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ
- স্নায়ুতন্ত্রের কিছু রোগ
- কিছু ভিটামিনের ঘাটতি
কোন ওষুধে রক্তচাপ কমে যেতে পারে?
কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়ও লো ব্লাড প্রেসার হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে -
- উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ
- হৃদ্রোগের কিছু ওষুধ, যেমন বিটা ব্লকার ও নাইট্রোগ্লিসারিন
- প্রস্রাব বাড়ানোর ওষুধ
- কিছু বিষণ্নতার ওষুধ
- পুরুষদের যৌন সমস্যার কিছু ওষুধ
কোনো ওষুধ খাওয়ার পর রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ না করে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। প্রয়োজনে তিনি ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন বা অন্য ওষুধ দিতে পারেন।
কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?
সব সময় লো ব্লাড প্রেসারে কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো পর্যাপ্ত রক্ত না পেলে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে।
- অতিরিক্ত দুর্বল বা ক্লান্ত লাগা
- মাথা ঘোরা
- মনে হওয়া যে অজ্ঞান হয়ে যাবেন
- বমি বমি ভাব
- ঠান্ডা ও ঘামযুক্ত ত্বক
- ঝাপসা দেখা
- মন খারাপ বা বিষণ্নতা
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
কীভাবে চিকিৎসা করা হয়?
চিকিৎসা নির্ভর করে রক্তচাপ কমার কারণের ওপর।
অনেকের ক্ষেত্রে কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তবে লক্ষণ থাকলে জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন এবং প্রয়োজনে ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়।
জীবনযাপনে যেসব পরিবর্তন উপকারী
পর্যাপ্ত পানি পান করুন: শরীরে পানির ঘাটতি লো ব্লাড প্রেসারের অন্যতম কারণ। তাই পর্যাপ্ত পানি পান করুন। ডায়রিয়া, বমি বা অতিরিক্ত গরমে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে।
ধীরে ধীরে দাঁড়ান: শোয়া বা বসা অবস্থা থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়াবেন না। ধীরে ধীরে উঠে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করুন।
দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবেন না: অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হলে মাঝেমধ্যে পা নড়াচড়া করুন বা কিছুক্ষণ হাঁটুন।
অল্প অল্প করে বারবার খাবার খান: খাবারের পর রক্তচাপ কমে গেলে একবারে বেশি খাবার না খেয়ে অল্প অল্প করে কয়েকবার খাওয়ার অভ্যাস করতে পারেন।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন: অনেকের ক্ষেত্রে ভয়, উদ্বেগ বা অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে রক্তচাপ কমে যেতে পারে। তাই এসব পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
কখন ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে?
যদি অন্য কোনো রোগের কারণে রক্তচাপ কমে যায়, তাহলে প্রথমে সেই রোগের চিকিৎসা করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসক রক্তচাপ বাড়ানোর ওষুধ দিতে পারেন। বিশেষ করে অরথোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন গুরুতর হলে ও জীবনযাপনের পরিবর্তনে উপকার না মিললে এই ধরনের ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে।
শকের কারণে রক্তচাপ কমে গেলে হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা দিতে হয়। এ সময় শিরায় তরল দেওয়া, প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ এবং শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর কার্যকারিতা স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
যেসব জটিলতা হতে পারে
পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়া: হঠাৎ রক্তচাপ কমে গেলে মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
শক: রক্তচাপ খুব বেশি কমে গেলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না। তখন শক হতে পারে। শকের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে ঠান্ডা ও ঘামযুক্ত ত্বক, খুব দ্রুত বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন এবং দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা।
এটি একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি। এমন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের যেকোনো পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
- বারবার মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
- রক্তচাপ ৯০/৬০-এর নিচে নেমে যাওয়া এবং সঙ্গে লক্ষণ থাকা
- বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা তীব্র দুর্বলতা অনুভব করা
- লো ব্লাড প্রেসারের সঙ্গে ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ বা অন্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকা
- নতুন কোনো ওষুধ শুরু করার পর রক্তচাপ কমে যাওয়া
লো ব্লাড প্রেসার সব সময় ভয় পাওয়ার মতো বিষয় নয়। অনেকের রক্তচাপ স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কম থাকে এবং তাতে কোনো সমস্যা হয় না। তবে যদি এর সঙ্গে মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়া, শ্বাসকষ্ট বা অতিরিক্ত দুর্বলতার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে সেটিকে অবহেলা করা উচিত নয়।
সঠিক কারণ শনাক্ত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই লো ব্লাড প্রেসার সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
সূত্র: হেলথলাইন






