খালি পেটে লিচু খেলে কী কী সমস্যা হতে পারে, জানাচ্ছেন চিকিৎসক

গরমের দিনে রসালো লিচু দেখলে লোভ সামলানো কঠিন। মিষ্টি আর হালকা টক স্বাদের এই ফল অনেকেরই পছন্দের তালিকায় থাকে। বাজারে লিচু উঠলেই ঘরে ঘরে তা কিনে আনার দৃশ্যও খুব পরিচিত।
তবে ইন্ডিয়ান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স (আইএপি)-এর বিহার শাখার প্রাক্তন সভাপতি এবং সিনিয়র শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. অরুণ শাহ বলেন, এই জনপ্রিয় ফল খাওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু সতর্কতা জরুরি। বিশেষ করে খালি পেটে লিচু খাওয়া শরীরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি আরও বেশি।
ডা. অরুণের মতে, খালি পেটে বেশি পরিমাণ লিচু খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ কমে যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এটি মস্তিষ্কে গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে, যাকে বলা হয় অ্যাকিউট এনসেফালাইটিস সিনড্রোম বা AES।
কেন খালি পেটে লিচু খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ
চিকিৎসকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, লিচুতে প্রাকৃতিকভাবে কিছু রাসায়নিক উপাদান থাকে। এর মধ্যে ‘হাইপোগ্লাইসিন এ’ এবং ‘এমসিপিজি’ নামের দুটি উপাদান শরীরে গ্লুকোজ তৈরির প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
খালি পেটে লিচু খেলে শরীরে আগে থেকেই শক্তির ঘাটতি থাকে। তখন এই উপাদানগুলো রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত কমিয়ে দেয়। এর ফলে শরীরে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, বমি এমনকি মস্তিষ্কের কার্যক্রমেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের শরীর এই পরিস্থিতি সামলাতে পারে না। কারণ তাদের শরীরে প্রয়োজনীয় শক্তির মজুত তুলনামূলক কম থাকে।
এনসেফালাইটিসের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক তৈরি হয়
চিকিৎসকদের মতে, লিচুর বিষক্রিয়া থেকে তৈরি হওয়া মারাত্মক হাইপোগ্লাইসেমিয়া অনেক সময় মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে। এর ফলে খিঁচুনি, অচেতন হয়ে যাওয়া বা কোমার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ, ভারত, ভিয়েতনাম ও জ্যামাইকার মতো কয়েকটি দেশে অতীতে লিচুর মৌসুমে শিশুদের মধ্যে অ্যাকিউট এনসেফালাইটিস সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর বেশি পরিমাণ লিচু খেলে ঝুঁকি বাড়ে।
যাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি
চিকিৎসকদের মতে, কিছু মানুষ অন্যদের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। যেমন-
- ১৫ বছরের কম বয়সি শিশু
- অপুষ্টিতে ভোগা ব্যক্তি
- যারা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকেন
- যারা খাবার বাদ দিয়ে শুধু ফল খেয়ে থাকেন
যেসব লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে
লিচু খাওয়ার পর সমস্যার লক্ষণ সঙ্গে সঙ্গে নাও দেখা দিতে পারে। ধীরে ধীরে কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
প্রাথমিক লক্ষণ-
- বমি
- অতিরিক্ত ঘাম
- দুর্বল লাগা
- মাথা ঘোরা
গুরুতর লক্ষণ-
- খিঁচুনি
- বিভ্রান্তি
- অচেতন হয়ে যাওয়া
- কোমায় চলে যাওয়া
এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
নিরাপদে লিচু খাওয়ার উপায়

চিকিৎসকদের মতে, কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললে নিরাপদভাবেই লিচু খাওয়া যায়।
তিনি বলেন খালি পেটে লিচু না খাওয়া, বিশেষ করে শিশুদের আগে স্বাভাবিক খাবার খাওয়ানো, একসঙ্গে বেশি লিচু না খাওয়া, ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং অতিরিক্ত কাঁচা লিচু এড়িয়ে চলা নিরাপদে লিচু খাওয়ার কিছু সাধারণ উপায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিমিত পরিমাণে এবং খাবারের পরে লিচু খেলে সাধারণত সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।
সব সতর্কতার পরও লিচু কিন্তু পুষ্টিগুণে ভরপুর একটি ফল। এতে রয়েছে ভিটামিন সি, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং প্রচুর পানি, যা শরীরকে হাইড্রেট রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও ত্বকের স্বাস্থ্যের জন্যও এটি উপকারী।
তবে যেকোনো উপকারী খাবারের মতো এটিও সঠিক নিয়মে খাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনভাবে খেলে গরমের এই জনপ্রিয় ফল উপভোগ করা যায় নিরাপদভাবেই।
সূত্র: এনডিটিভি
.png)






