স্পেনকে ‘নকল’ করেই আর্জেন্টিনার সাফল্য?

বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি হতে যাওয়া আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যে মিল শুধু বলের দখল কিংবা ছোট ছোট পাসে নয়। দুই দেশের ফুটবল পরিচালনা, কোচ তৈরির প্রক্রিয়া এবং বয়সভিত্তিক দল থেকে জাতীয় দলে খেলোয়াড় তুলে আনার পদ্ধতিতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য। আর সেই সংযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন লিওনেল স্কালোনি।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএসের বিশ্লেষণ, ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত স্পেনকে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে নিয়ে যাওয়া কাঠামো থেকেই নিজেদের নতুন পথের ধারণা পেয়েছিল আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। সেই মডেল নিজেদের ফুটবল সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে প্রয়োগ করেছে তারা।
স্পেনের সেই সোনালি সময়ে দেশটির ফুটবল ফেডারেশন কেবল শক্তিশালী একটি জাতীয় দল তৈরি করেনি। বয়সভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে একই ধরনের খেলার দর্শন, নিজেদের ব্যবস্থার মধ্যে কোচ তৈরি এবং তরুণ খেলোয়াড়দের ধাপে ধাপে জাতীয় দলে আনার একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো গড়ে তুলেছিল।
আর্জেন্টিনার পরিবর্তনের শুরুটাও একজন তরুণ কোচকে ঘিরে। খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করার পর ২০১৭ সালে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের লাস রোসাস একাডেমিতে কোচিংয়ের প্রশিক্ষণ নেন স্কালোনি। সেখানে তার প্রশিক্ষকদের একজন ছিলেন বর্তমান স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে।
২০১৮ বিশ্বকাপের পর আর্জেন্টিনার অন্তর্বর্তীকালীন কোচের দায়িত্ব পাওয়ার আগে জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না স্কালোনির। স্পেনের ল’আলকুদিয়ায় অনুষ্ঠিত কোতিফ প্রতিযোগিতায় আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-২০ দলকে শিরোপা এনে দিয়েছিলেন তিনি। সেটিই ছিল তার কোচিং সামর্থ্যের প্রথম বড় প্রমাণ।
তবু জাতীয় দলের দায়িত্ব দেওয়ার পর আর্জেন্টিনায় ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। একাধিক ফাইনালে হেরে বিপর্যস্ত একটি দলকে অনভিজ্ঞ একজন কোচের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত মানতে পারেননি অনেকে। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্বে ইতিবাচক ফল পাওয়ার পর স্কালোনিকেই স্থায়ী কোচ করে এএফএ।
এরপর জাতীয় দলের চারপাশে সাবেক খেলোয়াড়দের নিয়ে একটি কোচিং কাঠামো গড়ে তোলেন স্কালোনি। পাবলো আইমার, ওয়াল্টার স্যামুয়েল ও রবার্তো আয়ালাকে নিজের সঙ্গে রাখেন। বয়সভিত্তিক দলগুলোর বিভিন্ন দায়িত্বেও আসেন হাভিয়ের মাচেরানো ও দিয়েগো প্লাসেন্তের মতো সাবেক ফুটবলাররা।
স্পেনও দীর্ঘদিন ধরে সাবেক খেলোয়াড় ও নিজেদের ব্যবস্থায় প্রশিক্ষিত কোচদের বয়সভিত্তিক দল থেকে জাতীয় দল পর্যন্ত কাজে লাগিয়েছে। দে লা ফুয়েন্তে নিজেই স্পেনের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলের দায়িত্ব পালন করে সিনিয়র দলের কোচ হয়েছেন।
আর্জেন্টিনাও ২০২১ সালে বয়সভিত্তিক দলগুলোর জন্য একটি আলাদা পদ্ধতিগত উন্নয়ন বিভাগ গড়ে তোলে। নির্বাচিত খেলার ধরন অনুযায়ী প্রতিভা বিকাশ, কোচ ও পর্যবেক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং সব বয়সের দলের মধ্যে একটি অভিন্ন পরিচয় তৈরিই ছিল সেই প্রকল্পের উদ্দেশ্য।
স্কালোনির অধীনে মাঠের আর্জেন্টিনাও বদলেছে। লিওনেল মেসির প্রতিভার ওপর নির্ভরতা থাকলেও তাকে এখন আর বিচ্ছিন্নভাবে ম্যাচ জেতার দায়িত্ব নিতে হয় না। এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও রদ্রিগো দি পলের মতো বল ব্যবহারে দক্ষ মিডফিল্ডারদের উপস্থিতি মেসির সঙ্গে দলের সংযোগ বাড়িয়েছে।
স্পেনের সোনালি প্রজন্মে সের্হিও বুসকেতস, জাভি হার্নান্দেজ ও আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা যে ভূমিকা পালন করেছিলেন, বর্তমান দলে রদ্রি, পেদ্রি, ফাবিয়ান রুইস ও মিকেল মেরিনো সেই ধারাই এগিয়ে নিচ্ছেন। আর্জেন্টিনাও নিজেদের মিডফিল্ডে দক্ষতা ও পাস দেওয়ার সামর্থ্য বাড়িয়ে একই ধরনের ভারসাম্য পেয়েছে।
তবে আর্জেন্টিনার সাফল্যকে শুধু স্পেনকে নকল করার ফল বলা সরলীকরণ হবে। স্প্যানিশ কাঠামোর কিছু ধারণা গ্রহণ করলেও স্কালোনির দল ধরে রেখেছে নিজেদের চেনা লড়াকু মানসিকতা, দ্রুত অ্যাটাক এবং ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশল বদলের ক্ষমতা। স্পেন যেখানে বলের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে দমিয়ে রাখতে চায়, আর্জেন্টিনা সেখানে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতেও স্বচ্ছন্দ।
এই মিশ্রণেই স্কালোনির অধীনে দুটি কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা ও ২০২২ বিশ্বকাপ জিতেছে আর্জেন্টিনা। এবার টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছেছে তারা।
অন্যদিকে দে লা ফুয়েন্তের স্পেন ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হয়ে এসেছে বিশ্বকাপে। টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থাকা দলটি এখন ২০১০ সালের পর দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের সামনে।
ফলে এবারের ফাইনাল শুধু মেসি ও লামিনে ইয়ামাল কিংবা আর্জেন্টিনা ও স্পেনের দ্বৈরথ নয়। একসময় স্পেনের ফুটবল ব্যবস্থায় প্রশিক্ষণ নেওয়া স্কালোনি এখন সেই ব্যবস্থারই অন্যতম প্রতিনিধি দে লা ফুয়েন্তের প্রতিপক্ষ। শিক্ষকের সামনে দাঁড়িয়ে ছাত্র, আর মূল মডেলের সামনে তার সফল আর্জেন্টাইন রূপ।
বাংলাদেশ সময় সোমবার রাত ১টায় নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে শুরু হবে বিশ্বকাপ ফাইনাল।
.png)






