মহাখালীতে ২০০ কোটি টাকার সরকারি জমি ইস্টার্ন হাউজিংয়ের দখলে

মহাখালী বাস টার্মিনালসংলগ্ন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) ১ দশমিক ০৮৪০ একর জমি দখলে রেখেছে ইস্টার্ন হাউজিং। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে থাকা এই জমির বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা।
যানজট নিরসনে জমিটি উদ্ধার করে অস্থায়ীভাবে টার্মিনালের নামে বরাদ্দ দিতে সম্প্রতি ডিএনসিসিকে চিঠি দিয়েছে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ।
ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বাস চলায় মহাখালী টার্মিনালে এমনিতেই জায়গার তীব্র সংকট। বাধ্য হয়ে চালকেরা মূল সড়কে বাস পার্ক করায় মহাখালী ফ্লাইওভার, আমতলী ও গুলশান লিংক রোডে প্রতিদিন দীর্ঘ যানজট তৈরি হচ্ছে। অথচ টার্মিনালের পাশেই সওজের এই বিশাল সরকারি জমিটি অব্যবহৃত পড়ে আছে।
সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, মহাখালী বাস টার্মিনালের পূর্ব পাশের ৩ দশমিক ৪১৩২ একর জমির মধ্যে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের বৈধ জমি ১ দশমিক ৭৫ একর। কিন্তু বাস্তবে তারা দখলে রেখেছে ২ দশমিক ৮ একর।
সওজের রেকর্ড অনুযায়ী, তাদের জমির পরিমাণ ১ দশমিক ৬০৮৮ একর। কিন্তু সংস্থাটির দখলে আছে মাত্র শূন্য দশমিক ৫২৪৮ একর। বাকি ১ দশমিক ০৮৪০ একর চলে গেছে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের নিয়ন্ত্রণে।
একই এলাকায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ০ দশমিক ০৫৪৪ একর জমি অবশ্য তাদের নিজেদের দখলে রয়েছে।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সহসভাপতি (অর্থ) হারুন অর রশিদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘তেজগাঁও-মহাখালী অঞ্চলে প্রতি কাঠা জমির মূল্য বর্তমানে ২ থেকে ৪ কোটি টাকা। সেই হিসাবে গড়ে কাঠাপ্রতি ৩ কোটি টাকা ধরলেও এই বিতর্কিত ও বেদখল হওয়া জমির (ইস্টার্ন হাউজিংয়ের দখলে থাকা) বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা।’
সরকারি জমিতে হাউজিংয়ের গ্যারেজ
সরেজমিনে মহাখালী বাসস্ট্যান্ড ও ডিএনসিসি হাসপাতালসংলগ্ন জায়গাটিতে গিয়ে দেখা যায়, ইস্টার্ন হাউজিং সেখানে তাদের আবাসন ব্যবসার মালামালের স্টোরেজ ও গাড়ির গ্যারেজ বানিয়ে রেখেছে। একতলা কয়েকটি ভবন স্টাফদের আবাস ও অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ট্রাফিক পুলিশের চিঠির পর মহাখালী বাস মালিক সমিতি বাসস্ট্যান্ডের দেয়াল ভেঙে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের দখলে থাকা জমির একাংশ নিজেরাই দখলে নিয়েছে। প্রায় এক মাস ধরে সেখানে মাটি ফেলে বাসস্ট্যান্ডের সঙ্গে একীভূত করার কাজ চলছে।
ইস্টার্ন হাউজিংয়ের মেকানিক্যাল বিভাগের কর্মকর্তা সামিউল আহসান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘জায়গাটিতে আগে আমাদের মালপত্র ছিল। মাসখানেক আগে বাসস্ট্যান্ডের লোকজন এটির দখল নেয়।’
ইস্টার্ন হাউজিংয়ের আরেক কর্মচারী বলেন, ‘আমি ৩৩ বছর ধরে এখানে চাকরি করছি। প্রথম থেকেই দেখে আসছি, জায়গাটি মালামাল রাখার স্টোরেজ ও গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আগে জানতাম এটি হাউজিংয়ের জায়গা, এখন শুনি সড়কের।’
ডিএনসিসির পরিবহন ব্যবস্থাপক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মেহেদী হাসান বলেন, ‘জায়গার মালিক আমরা নই। তাই আমরা সেটির দখল বা সেখানে কোনও উন্নয়নকাজ চালাতে পারি না। পুলিশের চিঠি পাওয়ার পর সেটি সম্পত্তি বিভাগে পাঠানো হয়েছে। এখন সেখানে মহাখালী বাস মালিক সমিতি নিজেরাই উচ্ছেদ করে জায়গাটির উন্নয়ন করছে।’
মহাখালী বাস মালিক সমিতির বর্তমান সভাপতি একতা পরিবহনের মালিক সিরাজুল ইসলাম সিরাজ। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘১৫-২০ দিন আগে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের এমডির উপস্থিতিতে জমি মেপে কিছু অংশ বের করা হয়েছে। তবে দেড় বিঘারও বেশি জমি এখনও হাউজিংয়ের দখলে। সেখানে প্রচুর মালপত্র রাখা আছে। তারা ৪-৫ দিনের মধ্যে জায়গা খালি করে দেওয়ার কথা বললেও এখনও খালি করেনি। এখন আমরা নিজেরাই মাটি ফেলে উন্নয়ন করছি।’
সওজের জায়গায় বাস মালিক সমিতির উন্নয়নকাজ চালানো নিয়ে প্রশ্নের জবাবে সিরাজুল ইসলাম সিরাজ বলেন, ‘টার্মিনালের উন্নয়ন করবে সিটি করপোরেশন। কিন্তু জায়গাটি সওজ তাদের লিখে না দেওয়ায় তারা উন্নয়ন করতে চাইছে না। তাই বাধ্য হয়ে আমরাই উন্নয়ন করছি।’
তিনি বলেন, ‘আগে মহাখালীতে বাস ছিল ৪৫০টি। এখন বাসের সংখ্যা ১৪০০। এত বাস রাখার জায়গা নেই। প্রতিদিন কোটি টাকার ৩-৪টি বাস ডাম্পিং করছে। বাসের লাইসেন্স করার সময় নিজস্ব ডিপো রাখার শর্ত থাকলেও গাবতলীতে দু-একটি বাসের নিজস্ব ডিপো আছে। এ ছাড়া কারও ডিপো নেই। আমার একতা পরিবহনের ১২০টি গাড়ি চলে, কোনো ডিপো নেই। সরকার ইস্টার্ন হাউজিংয়ের পুরো জমি দখলে নিয়ে উন্নয়ন করলে আমরা হাপ ছেড়ে বাঁচি। অথবা দ্রুত টার্মিনাল স্থানান্তর করুক।’
যানজট কমানোর উদ্যোগ
মহাখালীর যানজট স্থায়ীভাবে কমাতে সরকার একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই পরিকল্পনায় দূরপাল্লার বাসগুলো পূর্বাচল, হেমায়েতপুর, কাঁচপুর ও কেরানীগঞ্জের বাঘৈরে সরিয়ে নেওয়া হবে। তখন মহাখালী, গাবতলী ও সায়েদাবাদ টার্মিনাল শুধু ঢাকার অভ্যন্তরীণ রুটের সিটি বাস টার্মিনাল বা ডিপো হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
পূর্বাচলে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হওয়ায় তাৎক্ষণিক জনদুর্ভোগ কমাতে উদ্যোগ নেয় ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। সওজের বেদখল জমিসহ আশপাশের সরকারি জমি উদ্ধার করে টার্মিনালের নামে অস্থায়ী বরাদ্দ দিতে গত ১৯ মে ডিএমপি সদর দপ্তরের ক্রয় ও লজিস্টিকস (ট্রাফিক) বিভাগ থেকে ডিএনসিসি প্রশাসকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়, জায়গা স্বল্পতার কারণে চালকরা বাধ্য হয়ে মূল সড়কে বাস পার্কিং করছেন। এই অব্যবহৃত সম্পত্তি উদ্ধার করে টার্মিনালকে বরাদ্দ দিলে যানজট নিরসনে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমাদের কাছে তথ্য ছিল মহাখালী বাসস্ট্যান্ডের পাশের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার জমি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এর মধ্যে কিছু জমি অবৈধ দখল অবস্থায়ও আছে। আমরা এসব জমির কাগজপত্র সংগ্রহ করে এবং নথিপত্র বিশ্লেষণ করে ডিএনসিসিকে চিঠি দিয়েছি। এখন বাকি সিদ্ধান্ত সিটি করপোরেশনের।’
সরকারি জমিতে বেসরকারি ‘সমঝোতা’
ডিএমপির চিঠির পরও সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে দায় এড়ানোর প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। এই সুযোগে জমির একাংশের উন্নয়ন করে নিজেদের বাসের ডিপো বানাচ্ছে মহাখালী বাস মালিক সমিতি।
ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা ও পরিবহন মহাব্যবস্থাপক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ শওকত ওসমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মহানগর পুলিশের একটি চিঠি আমরা পেয়েছি। তবে দূরপাল্লার বাসের জন্য ঢাকার বাইরে নতুন টার্মিনাল করার বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত রয়েছে। মহাখালী বাসস্ট্যান্ডের পাশের সওজের জায়গাটি টার্মিনালের সঙ্গে একীভূত করা হবে কি না, সেটিও সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়। তাছাড়া ডিএনসিসি এই জায়গার মালিক নয়, তাই আমরা এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। তবে বর্তমান বাসস্ট্যান্ডের জমিও সওজের ছিল, তারা পরে করপোরেশনকে তা হস্তান্তর করেছে।’
সওজের এই জমি উদ্ধার বা টার্মিনালের জন্য অস্থায়ী বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মইনুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সরকারি জমি ইস্টার্ন হাউজিংয়ের দখলে থাকার বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিদ্দিক রহমানকে ফোন করেন এই প্রতিবেদক। পরে তার সহকারী ও হাউজিংয়ের নগর পরিকল্পনাবিদ মোস্তাফিজুর রহমান ফোনে এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মহাখালীর ওই জায়গাটি নিয়ে বাস মালিক সমিতির সঙ্গে আমাদের সমঝোতা হয়ে গেছে। জায়গাটির মালিক আমরাই, কিন্তু দীর্ঘদিন কাগজপত্র আপডেট না করায় তারা সেটি নিজেদের জায়গা ভেবেছে। বিষয়টি সমাধান হয়ে গেছে।’
জায়গার মালিক ইস্টার্ন হাউজিং হলে বাস মালিক সমিতি কেন স্ট্যান্ডের পাশের একটি বড় জায়গা একীভূত করে উন্নয়ন করছে? এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দিতে রাজি হননি তিনি।
.png)





