মানবপাচারের সাজানো মামলা দিয়ে ‘পলি-সোনিয়া’ চক্রের চাঁদাবাজি

মানবপাচারের সাজানো মামলা দিয়ে ‘পলি-সোনিয়া’ চক্রের চাঁদাবাজি
ছবি : এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

বিদেশে কর্মী পাঠানোর পর তাকে ‘নিখোঁজ’ দেখিয়ে করা হয় অপহরণ ও মানবপাচারের মামলা। এরপর মামলার ভয় দেখিয়ে আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা। রিক্রুটিং এজেন্সিকে টার্গেট করে পলি ও সোনিয়া নামের দুই নারীর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে এমন একটি চক্র। প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষা ও মামলার ধকল থেকে বাঁচতে এজেন্সিও তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। এমন দুটি ঘটনায় মামলার পর পুলিশের তদন্তে উঠে আসে উভয় ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে এই চক্র। 

ঘটনার সূত্রপাত নারায়ণগঞ্জের কামরুল হাসান পাভেল নামের একজন ব্যক্তিকে ঘিরে। মামলার নথিতে দেখা যায়, ২০২২ সালের ১১ এপ্রিল ‘ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাভেলকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। পরে তার স্ত্রী পলি আক্তার লিজা অভিযোগ করেন, তার স্বামী মানবপাচারের শিকার এবং চার লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছে। এমন অভিযোগে ওই বছরের ১৮ জুন তিনি র‍্যাব-৩–এ লিখিত অভিযোগ দেন। এর ভিত্তিতে র‍্যাব অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। মামলার ভিত্তিতে তাদের পল্টন থানায় সোপর্দ করা হয়। 

পরে পলি আক্তার ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে চাঁদা দাবি করে এবং চাঁদা দিলে মামলা আপস করতে রাজি হয়। উপায়ান্তর না দেখে ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল থেকে তাকে প্রথমে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দেওয়া হয়। টাকা পাওয়ার পর পলি আদালতে লিখিতভাবে জানান, তার স্বামী বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। স্বামীর ফোন বন্ধ থাকায় তখন ভুল বোঝাবুঝি থেকে মামলা করেছিলেন। ফলে আসামিদের জামিনে মুক্তির বিষয়ে তার কোনো আপত্তি নেই। 

 ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান মোসাহেদ হাসান এশিয়া পোস্টকে জানান, পাভেলকে সৌদিতে পাঠানোর কয়েকদিন পর তার স্ত্রী অফিসে এসে স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ   বিচ্ছিন্ন হওয়ার অভিযোগ করেন। সৌদির সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাজে যোগ দেওয়ার পর পাভেল সেখান থেকে চলে যান। পরে এ ঘটনায় পলি আক্তারের করা মামলায় গ্রেপ্তার হন তিনি। গ্রেপ্তারের পর পলি স্বামীকে বিদেশে পাঠানোর খরচ বাবদ সাড়ে ৩ লাখ এবং মামলার খরচ বাবদ ৭ লাখ টাকা দাবি করেন। পরে পাভেলকে দেশে  ফেরানো ও আদালতে হাজিরার জন্য আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। দুই ধাপে মোট ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার পর ১৬ জুলাই মোসাহেদ হাসানসহ অন্যরা খালাস পান।

 পলি আক্তারের মামলাটি ২০২২ সালেই শেষ হয়ে যায়। এর তিন বছরের মাথায় ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে প্রায় একই ধরনের আরেকটি অভিযোগ আসে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সোনিয়া আক্তার নামে এক নারী পল্টন থানায় মোসাহেদ হাসানের বিরুদ্ধে মামলা করতে যান। তার অভিযোগ, ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে তার স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠানোর পর সেখানে আটকে রেখে ৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। 

সোনিয়া আক্তারের অভিযোগের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় পল্টন থানা প্রথমে মামলা নিতে চায়নি। পরে আদালতের নির্দেশে মামলা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু তিন বছর আগে পলি আক্তারের করা মামলার সঙ্গে সোনিয়া আক্তারের বর্ণনার মিল থাকায় তাদের দুজনের বিষয়ে খোঁজ নেয় পুলিশ। পরে ডিবির তদন্তে উভয়ের মধ্যে ফোনালাপের তথ্য পাওয়া যায়। পুলিশের তদন্ত ও পলি আক্তারের ফোন কল রেকর্ডে এটি স্পষ্ট যে, দুটি ঘটনাই ছিল সাজানো। মূলত এজেন্সির কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিতেই অপহরণের নাটক সাজিয়ে মামলা করা হয়। তবে পলি আক্তারের দাবি, স্বামীকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার শর্তে তিনি মামলা তুলে নিতে রাজি হন। 

 

পলি আক্তার ও সোনিয়া আক্তারের সম্পর্ক পলি আক্তার ও সোনিয়া আক্তারের যোগাযোগ
পুলিশের গোয়েন্দা শাখার তদন্তে উভয়ের ফোনালাপ বিশ্লেষণে দেখা যায়, পলি আক্তারের ০১৮৮…৫৫৯ এবং সোনিয়া আক্তারের ০১৮৩…২৮৯ নম্বরের মধ্যে প্রথম যোগাযোগ হয় ২৭ জুলাই ২০২৫। সেদিন পলি আক্তারের অবস্থান  ছিল নারায়ণগঞ্জ সদরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে তার বাসায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নারায়ণগঞ্জে আসার পথে নরসিংদী অবস্থানকালে সোনিয়া আক্তার তার সঙ্গে কথা বলেন। একই দিনে তার অবস্থান পলি আক্তারের ঠিকানাতেও দেখা যায়। এর আগে কখনও ওই স্থানে সোনিয়ার নম্বরের অবস্থান দেখা হয়নি। ২৯ জুলাই তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিরে যান। পরে বিভিন্ন সময়ে তাদের মধ্যে ফোনালাপ চলতে থাকে। প্রথমবার পলির বাসায় গিয়ে মামলার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে যায় এবং দ্বিতীয়বার ২ আগস্ট পলির বাসায় আসে সনি। ৩ আগস্ট ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে মামলা করে সোনিয়া। মামলার পর প্রায় এক মাস পলির বাসায় অবস্থান করে সোনিয়া। সোনিয়া আক্তারের মামলার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়ে পলি আক্তার বলেন, সোনিয়ার সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। বরং সোনিয়া আক্তারের করা মামলার কিছুদিন পর মোসাহেদ হাসান একটি সাজানো মামলায় তাকে ও সোনিয়াকে আসামি করেন। এরপরই তাদের যোগাযোগ শুরু হয়। সোনিয়া আক্তারও এই মামলার আগে পলি আক্তারের এলাকায় তার ফোন নম্বরের লোকেশন মিল থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেন। 

 

 

 রিজার্ভেসন তালিকা।   ডিবির তদন্ত নথিতে দেখা যায়, সোনিয়া আক্তারের স্বামী ফয়জুল ইসলাম ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে মোসাহেদ হাসান এবং মৌসুমী   রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সৌদিতে মাসিক দুই হাজার রিয়াল বেতনের চাকরির প্রস্তাবে সম্মত হন। পরে যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২০২৫   সালের ১১ জুলাই তাকে শ্রমিক ভিসায় সৌদি আরবে পাঠানো হয়। পৌঁছানোর পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা তাকে গ্রহণ করেন। 

 

 

 

 

 

 

 

 

ফয়জুল ও সহকর্মীদের স্বীকারোক্তি 
২০২৫ সালের ১১ জুলাই রাত ১০টা ৩৫ মিনিট। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একই ফ্লাইটে যাত্রা করেন ফয়জুল ইসলাম, জহিরুল হোসাইন ও আব্দুস সাত্তার। তিনজনই একই এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে যান। ফয়জুল ও সহকর্মীদের স্বীকারোক্তি পরে দেশটির আলম খলিল আল-আনজি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে যোগ দেন। 

অনলাইন কলে তাদের বক্তব্য নেয় পুলিশ। আব্দুস সাত্তার জানান, তারা বৈধভাবে গিয়ে কাজে যোগ দিয়েছেন। তবে দুই দিন পর ফয়জুল ইসলাম কর্মস্থল ত্যাগ করেন। কোনো মুক্তিপণ দাবি বা শারীরিক হেনস্তার ঘটনা ঘটেনি। পরে ফয়জুল ইসলামও ডিবির কাছে স্বীকার করেন, তিনি স্বেচ্ছায় ওই প্রতিষ্ঠান ছেড়েছেন এবং নিরাপদে আছেন। 

 

 

 

মুক্তিপণ দাবির অসংগতি 
সোনিয়া আক্তারের মামলায় ৪ লাখ ৬২ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ করা হয়। বলা হয়, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৪০৪৬১২১০০০০৫৫০৪ নম্বর হিসাবে ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর ৫০ হাজার টাকা, মৌসুমী রহমানের বিকাশ নম্বরে ২১ নভেম্বর ২৫ হাজার, ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ৩০ হাজার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০ হাজার এবং ২৮ এপ্রিল ৮০ হাজার টাকা পাঠানো হয়। এ ছাড়া মোসাহেদ হাসানের বিকাশ নম্বরে ১ জুলাই ১ লাখ ৩৫ হাজার ও ৬৫ হাজার টাকা পাঠানো হয়।

মুক্তিপণ তবে ডিবির অনুসন্ধানে প্রিমিয়ার ব্যাংকের উল্লিখিত নম্বরে ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনালের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। মোসাহেদ হাসানের বিকাশ লেনদেন বিশ্লেষণে ২১   নভেম্বর   ২০২৪ তারিখে ০১৮৬…৭৯০ নম্বর থেকে ২৫ হাজার, ১ জুলাই ০১৭৪…৮০১ থেকে ১ লাখ ৩৫ হাজার এবং ০১৭৯…০৬৬ থেকে ৬৫ হাজার টাকা পাওয়ার তথ্য মেলে। তিন দফায়   ২   লাখ ২৫ হাজার টাকা লেনদেনের তথ্য মিললেও বাকি অর্থের বিষয়ে কোনো তথ্য মেলেনি। এ ছাড়া সোনিয়া আক্তারের কল রেকর্ডে অভিযোগে উল্লেখিত নম্বরগুলো থেকে মুক্তিপণ দাবির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। 

bigStoryContent
bigStoryContent
bigStoryContent

 

মানবপাচার সংক্রান্ত অভিযোগের অসংগতি 
ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে সোনিয়ার মামলায় মানবপাচারের অভিযোগ আনা হলেও ডিবির তদন্তে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির মূল সংস্থা ধাঁনসিঁড়ি ওভারসিস লিমিটেড আইনানুগভাবে নিবন্ধিত এবং তাদের কার্যক্রম নিয়মিতভাবে চলছে। তদন্তে কোনো পূর্ববর্তী মানবপাচারের অভিযোগ বা মামলা পাওয়া যায়নি।

ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনালের বৈধতা।  গোয়েন্দা-মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) রফিউদ্দিন মোহাম্মদ যোবায়ের জানান, এই মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই এটি আদালতে পাঠানো হয়েছে। 

  অনুমোদিত এজেন্সির বিরুদ্ধে মানবপাচার মামলা নিয়ে কথা হয় জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক আশরাফ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, জনশক্তি  কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ক্লিয়ারেন্স নিয়ে যারা যায়, তাদের পাচার হওয়ার উদাহরণ আমরা পাইনি।   বিএমইটির ক্লিয়ারেন্স নিয়ে অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে গেলে সেটাকে পাচার বলা যায় না। তবে কেউ যদি গিয়ে চাকরি না পায় বা প্রতারিত হয়

সেক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। মানবপাচার মামলা দিয়ে কোনো অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানকে হয়রানির তথ্য পেলে আমরা এ নিয়ে আলোচনা করব।

২০২৫ সালের মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন। তবে একই রকম আরও বিড়ম্বনার অভিযোগ তুলছে ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল। গত ৯ ফেব্রুয়ারি শাহজাহান নামে এক ব্যক্তি পল্টন থানায় মানবপাচার ও মুক্তিপণের অভিযোগে মামলা করতে যান। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপে মামলাসংক্রান্ত বিষয়ে পলি আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি সামনে আসে। প্রতারণার ফাঁদ ধরা পড়ে যাওয়ায় পরে শাহজাহান আর মামলা করেননি। 

সামগ্রিক বিষয়ে কথা হয় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, এসব কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি কোনো বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি সমস্যায় পড়ে, আমরা তাদের পাশে দাঁড়াব।