করপোরেট চাকরি ছেড়ে প্রথম বিসিএসেই পুলিশ ক্যাডার বুটেক্সের রাহুল

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক
করপোরেট চাকরি ছেড়ে প্রথম বিসিএসেই পুলিশ ক্যাডার বুটেক্সের রাহুল
৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে ১৯তম স্থান অর্জনকারী রাহুল ভৌমিক। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) থেকে টেক্সটাইল প্রকৌশলে স্নাতক শেষ করে করপোরেট জীবনে পা রেখেছিলেন রাহুল ভৌমিক। ডেনিম মার্চেন্ডাইজিং এবং দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় টেক্সটাইল গ্রুপে কাজ করলেও তার লক্ষ্য ছিল বিসিএস। স্থায়ী চাকরি ছেড়ে এক বছর ধরে নিয়মিত প্রস্তুতি নেন। সেই সিদ্ধান্তই এনে দেয় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। প্রথমবারের মতো বিসিএসে অংশ নিয়ে ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে দেশজুড়ে ১৯তম স্থান অর্জন করেন তিনি।

করপোরেট চাকরি ছেড়ে বিসিএসের প্রস্তুতি, বুটেক্সের স্মৃতি, সাফল্যের পেছনের গল্প, প্রস্তুতির কৌশল, ক্যাডার নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে এশিয়া পোস্ট–এর সঙ্গে কথা বলেছেন রাহুল ভৌমিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নাজমুল ইসলাম। পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ তুলে ধরা হলো।

এশিয়া পোস্ট: ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে দেশজুড়ে ১৯তম হয়েছেন। প্রথম বিসিএসেই এমন সাফল্যের অনুভূতি কেমন?

রাহুল ভৌমিক: প্রথম বিসিএসেই এমন সাফল্য পাওয়া নিঃসন্দেহে দারুণ এক অনুভূতি। পুলিশ ক্যাডারে দেশজুড়ে ১৯তম স্থান অর্জন করতে পারাটা আমার এবং আমার পরিবারের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের। এই অর্জনের পেছনে অনেক ত্যাগ, ধৈর্য ও পরিশ্রম রয়েছে। তাই ফলাফল প্রকাশের মুহূর্তটি আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে।

এশিয়া পোস্ট: আপনার শৈশব ও শিক্ষাজীবন সম্পর্কে জানতে চাই। বুটেক্সের দিনগুলো কেমন ছিল?

রাহুল ভৌমিক: বাবার গ্রামীণ ব্যাংকের চাকরির সুবাদে ছোটবেলায় আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকতে হয়েছে। বারবার বদলি হওয়ার কারণে অন্তত ৮ থেকে ১০টি স্কুলে পড়াশোনা করতে হয়েছে আমাকে। পরে বাবা চাকরি থেকে অবসর নিলে আমরা পাবনার চাটমোহরে আমাদের স্থায়ী নিবাসে চলে আসি। সেখানে ক্লাস এইট থেকে টেন পর্যন্ত পড়াশোনা করি। পড়াশোনায় দিন-রাত ডুবে থাকার স্বভাব আমার কখনোই ছিল না, তবে সবসময় ভালো করার একটা চেষ্টা থাকত। যার সুবাদে জেএসসি ও এসএসসিতে বেশ ভালো রেজাল্ট করি এবং এসএসসি পরীক্ষায় চাটমোহর থানায় প্রথম স্থান অধিকার করি। এরপর উচ্চমাধ্যমিকের জন্য আমরা বগুড়ায় চলে আসি এবং বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ থেকে এইচএসসিতে গোল্ডেন এ-প্লাস পাই। স্কুল-কলেজের এই বৈচিত্র্যময় ও চড়াই-উতরাইয়ের অধ্যায় পেরিয়েই মূলত বুটেক্সে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হয়।

আমার শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় কেটেছে বুটেক্সে। বিশেষ করে ওসমানী হলের স্মৃতিগুলো এখনো খুব মনে পড়ে। ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত আমি বিভাগের ক্লাস প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। মজার বিষয় হলো, হলের বন্ধুরা যখন রিডিংরুমে পড়াশোনা করত, আমি তখন বেশির ভাগ সময় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতাম, ঘুরতে যেতাম। তবে শিক্ষকদের সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল।

সত্যি বলতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বিসিএসে আসার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। আমার লক্ষ্য ছিল উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া এবং টেক্সটাইল খাতে নিজেকে আরও এগিয়ে নেওয়া। স্নাতক শেষ করা পর্যন্ত আমার পুরো মনোযোগ ছিল সেই দিকেই।

এশিয়া পোস্ট: করপোরেট জীবন থেকে বিসিএসের যাত্রা কীভাবে শুরু হলো? প্রস্তুতির সময়টা কেমন ছিল?

রাহুল ভৌমিক: বিএসসি শেষ করার পর দুটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ পাই। প্রথমে অ্যাপটেকে ডেনিম মার্চেন্ডাইজিং বিভাগে কাজ শুরু করি। পরে হামিম গ্রুপে যোগ দিই। শুরুতে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দাপ্তরিক কাজ হওয়ায় পড়াশোনার জন্য কিছুটা সময় পাওয়া যেত। পরিবারও আমাকে বিসিএসের প্রস্তুতিতে মনোযোগ দিতে উৎসাহ দিত। সে সময় চাকরির পাশাপাশি কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই ৪৬তম বিসিএসের প্রাথমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম।

তবে পরে সহকর্মী কমে যাওয়ায় অফিসের কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়। ফলে বিসিএসের মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন বুঝতে পারি, পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির জন্য বড় একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। তাই ২০২৪ সালের এপ্রিলে চাকরি ছেড়ে বাড়িতে ফিরে পুরোপুরি ৪৭তম বিসিএসের প্রস্তুতিতে মনোযোগ দিই।

এশিয়া পোস্ট: এই দীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা কে ছিলেন?

রাহুল ভৌমিক: এই সাফল্যের পেছনে আমার পরিবারই সবচেয়ে বড় শক্তি। বিশেষ করে আমার স্ত্রী, তাঁর পরিবার, আমার বাবা–মা, বোন ও দুলাভাই—সবার অবদান অনস্বীকার্য। তবে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন আমার স্ত্রী এবং পরিবার। ২০২৪ সালের এপ্রিলে চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। বিয়ের পর চাকরি ছেড়ে প্রায় বেকার অবস্থায় থাকা মোটেও সহজ ছিল না। সেই কঠিন সময়ে পরিবারের সবাই যেভাবে আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন, সাহস জুগিয়েছেন এবং মানসিকভাবে সমর্থন দিয়েছেন, সেটিই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।

এশিয়া পোস্ট: প্রস্তুতির জন্য বিশেষ কোনো টেকনিক অনুসরণ করেছিলেন কি? কোন দিকগুলো আপনাকে এগিয়ে রেখেছিল?

রাহুল ভৌমিক: আমার ব্যাকগ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং হওয়ায় ম্যাথ, ইংলিশ এবং সায়েন্স পার্ট আগে থেকেই বেশ স্ট্রং ছিল, যা আমাকে প্রিলিতে অনেক এগিয়ে রেখেছে। তবে আমাকে সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে বাংলা, সাধারণ জ্ঞান, ভূগোল ও নৈতিকতার মতো আর্টসের সাবজেক্টগুলো, যেগুলো সম্পূর্ণ নতুন করে দেখতে হয়েছে।

আমি অফলাইনে কোনো কোচিং বা মডেল টেস্ট দিইনি। আমি 'লাইভ এমসিকিউ' অ্যাপে ২০০ মার্কের সাপ্তাহিক প্রিলির পরীক্ষাগুলো বাসায় বসে নিয়মিত দিতাম। আমার কাছে সবচেয়ে কার্যকর বিষয় ছিল নিজের প্রস্তুতি নিয়মিত মূল্যায়ন করা।

এশিয়া পোস্ট: ক্যাডার পছন্দের ক্ষেত্রে নতুনদের কী বিষয় বিবেচনা করা উচিত?

রাহুল ভৌমিক: আমার পছন্দের তালিকায় প্রথমে ছিল প্রশাসন, এরপর পুলিশ, শুল্ক, কর এবং নিরীক্ষা ও হিসাব ক্যাডার। আমি পররাষ্ট্র ক্যাডারকে পছন্দের তালিকায় রাখিনি। আমার মতে, ক্যাডার নির্বাচন করার সময় অন্যের কথা নয়, নিজের মানসিকতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। যারা সরাসরি মানুষের জন্য কাজ করতে চান এবং চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে প্রস্তুত, তাদের জন্য প্রশাসন ও পুলিশ ভালো পছন্দ। আর যাঁদের উচ্চশিক্ষা বা বিদেশে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে, তাঁরা পররাষ্ট্র ক্যাডারকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন।

এশিয়া পোস্ট: বিসিএসপ্রত্যাশীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

রাহুল ভৌমিক: আমি কখনোই বলব না যে বিসিএসকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানাতে হবে। কারণ এই প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ সময়ের। তাই বিসিএসের পাশাপাশি অন্যান্য সরকারি চাকরি বা ব্যাংকের চাকরির জন্যও চেষ্টা করা উচিত, যাতে বিকল্প সুযোগ থাকে। নতুনদের বলব, বিশাল পাঠ্যসূচি দেখে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রথমে নিজের পছন্দের বা সহজ কোনো বিষয় দিয়ে শুরু করুন। প্রতিদিন অল্প হলেও নিয়মিত পড়ুন। বিসিএস প্রস্তুতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ধারাবাহিকতা। নিয়মিত পড়াশোনা করলে একসময় ভালো ফল অবশ্যই আসবে।

এশিয়া পোস্ট: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

রাহুল ভৌমিক: আমি ইতোমধ্যে ৫০তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছি। সেখানে উত্তীর্ণ হলে শুধু প্রশাসন ক্যাডারের জন্য মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেব, কারণ সেটিই আমার প্রথম পছন্দ। আর যদি তা না হয়, তাহলে বাংলাদেশ পুলিশে সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে দেশের মানুষের সেবা করতে চাই।