নীতি সুদহার: মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে অস্ত্র, নাকি কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প?

মো. সাইফুল ইসলাম মাসুম
নীতি সুদহার: মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে অস্ত্র, নাকি কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প?
ছবি সংগৃহীত

কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবচেয়ে শক্তিশালী নীতিগত অস্ত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নীতি সুদহার (Policy Rate বা Repo Rate)। এটি কেবল একটি সুদের হার নয়; বরং সমগ্র অর্থনীতিতে অর্থের মূল্য, ঋণের ব্যয়, বিনিয়োগের প্রবণতা, ভোগব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির গতিপথ নির্ধারণকারী একটি মৌলিক সংকেত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন নীতি সুদহার পরিবর্তন করে, তখন প্রকৃতপক্ষে তারা পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে একটি নতুন বার্তা দেয়—অর্থনীতিকে শীতল করতে হবে, নাকি আরও গতিশীল করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে বহাল রেখেছে। এ সিদ্ধান্তের মূল দর্শন হচ্ছে—অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ সংকুচিত করে চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণের মূল্য বাড়িয়ে দেয়, তখন ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহের ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। এর স্বাভাবিক প্রতিফলন ঘটে ঋণের সুদহারে। ফলে ব্যক্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উভয়ই নতুন ঋণ গ্রহণে অপেক্ষাকৃত সতর্ক হয়। ঋণনির্ভর ভোগ ও বিনিয়োগের গতি কমে, বাজারে অর্থের প্রবাহ সংকুচিত হয় এবং সামষ্টিক চাহিদা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কমতে শুরু করে।

এটি অর্থনীতির ভাষায় Monetary Transmission Mechanism—অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত কীভাবে ধাপে ধাপে পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে।

অন্যদিকে, অর্থনীতি যখন মন্দার মুখোমুখি হয়, শিল্পে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ে এবং কর্মসংস্থান কমতে থাকে, তখন একই নীতি সুদহারই প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার হাতিয়ারে পরিণত হয়। সুদহার কমিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোর জন্য অর্থ সংগ্রহ সহজ করে দেয়। এর ফলে ঋণ সস্তা হয়, বিনিয়োগ বাড়ে, উৎপাদন সম্প্রসারিত হয় এবং অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ নীতি সুদহার একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে, অন্যদিকে প্রয়োজন হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিনেও জ্বালানি যোগায়।

তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। এখানে মূল্যস্ফীতির বড় অংশই কেবল অতিরিক্ত চাহিদার কারণে নয়; বরং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিময় হার অবমূল্যায়ন, জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহে ব্যাঘাত এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার মতো Supply-side Factors দ্বারা প্রভাবিত। ফলে শুধুমাত্র নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। সুদের হার বৃদ্ধি সামষ্টিক চাহিদা কমাতে পারে, কিন্তু খাদ্য সরবরাহ, জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্য কিংবা সরবরাহ শৃঙ্খলের অদক্ষতা দূর করতে পারে না।

এখানেই নীতিনির্ধারণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদি মূল্যস্ফীতির উৎস মূলত সরবরাহজনিত হয়, তাহলে অতিরিক্ত কড়াকড়ি মুদ্রানীতি কখনও কখনও বিনিয়োগ ও উৎপাদনকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সংকুচিত করতে পারে। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানও চাপের মুখে পড়ে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নীতি সুদহার কার্যকর হতে হলে তার Transmission বা সঞ্চালন ব্যবস্থা দক্ষ হতে হবে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত দ্রুত ও পূর্ণমাত্রায় ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে আমানত ও ঋণের সুদহারে প্রতিফলিত হতে হবে। কিন্তু দীর্ঘদিন প্রশাসনিক সুদহার নিয়ন্ত্রণ, সুদের সীমা নির্ধারণ এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এই ট্রান্সমিশন ব্যবস্থা সবসময় কার্যকর ছিল না। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনেক সময় প্রত্যাশিত মাত্রায় বাস্তব অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হতে পারেনি।

এক্ষেত্রে রেপো রেটের পাশাপাশি রিভার্স রেপো রেটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাজারে অতিরিক্ত তারল্য সৃষ্টি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে অর্থ শোষণ করে নেয় এবং এর বিপরীতে একটি নির্ধারিত সুদ প্রদান করে। এর মাধ্যমে বাজারে অর্থের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। ফলে রেপো ও রিভার্স রেপো—উভয়ই মুদ্রানীতির পরস্পর পরিপূরক দুটি উপকরণ।

তবে একটি বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। নীতি সুদহার বৃদ্ধি ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। ফলে আমানতের সুদ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয় এবং ব্যাংকের Net Interest Margin (NIM) সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, দুর্বল সম্পদমান এবং প্রভিশনের চাপের মধ্যে থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য এটি একটি অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ। ফলে মুদ্রানীতির কঠোরতা যেন আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতাকে দুর্বল না করে, সে ভারসাম্য রক্ষা করাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম দায়িত্ব।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদহার নির্ধারণে বাজারভিত্তিক কাঠামোকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে। এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কারণ দীর্ঘমেয়াদে সুদের হার প্রশাসনিকভাবে নির্ধারণ না করে বাজারের বাস্তব চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়াই অধিক কার্যকর ও টেকসই।

তবে নীতি সুদহারকে কখনোই অর্থনীতির একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাজস্বনীতি, সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিতকরণ, কৃষি ও জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা—সবগুলো নীতির সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একা মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ জিততে পারে না; এটি একটি সমন্বিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রচেষ্টার বিষয়।

পরিশেষে বলা যায়, নীতি সুদহার বৃদ্ধি একটি প্রয়োজনীয় কিন্তু অসম্পূর্ণ নীতি। এটি মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে পারে, তবে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতার বিকল্প নয়। একটি দক্ষ, প্রতিযোগিতামূলক এবং সুশাসনভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা ছাড়া কেবল সুদের হার পরিবর্তন করে দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্থিতি কিংবা টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সফল মুদ্রানীতির প্রকৃত শক্তি সুদের হারে নয়; বরং সেই নীতিকে সমর্থনকারী শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান, কার্যকর বাজারব্যবস্থা এবং সুসমন্বিত অর্থনৈতিক শাসন কাঠামোর ওপরই নির্ভর করে।

লেখক: মো. সাইফুল ইসলাম মাসুম, ব্যাংকিং ও অর্থনীতি বিশ্লেষক