না ফেরার দেশে আর্জেন্টিনার ফুটবল কিংবদন্তি

আর্জেন্টিনা ও বোকা জুনিয়র্সের কিংবদন্তি ফুটবলার আন্তোনিও উবালদো রাত্তিন আর নেই। শনিবার ৮৯ বছর বয়সে মারা গেছেন ষাটের দশকের এই তারকা মিডফিল্ডার। তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে বোকা জুনিয়র্স।
শোকবার্তায় বোকা লিখেছে, ‘গভীর দুঃখের সঙ্গে আমাদের ক্লাবের আদর্শ ও প্রতীক আন্তোনিও উবালদো রাত্তিনের মৃত্যুতে শোক জানাচ্ছি। এই কঠিন সময়ে তার পরিবার ও প্রিয়জনদের প্রতি আমাদের সমবেদনা।’
রাত্তিনের পুরো ক্লাব ক্যারিয়ার কেটেছে বোকা জুনিয়র্সে। তিনি গর্ব করে বলতেন, জীবনে শুধু দুটি দলের জার্সি পরেছেন, বোকা ও আর্জেন্টিনার। ১৯ বছর বয়সে ১৯৫৬ সালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিভার প্লেটের বিপক্ষে বোকা-র মূল দলে অভিষেক হয়েছিল তার। প্রথম ম্যাচেই নজর কাড়ার পর দলের মাঝমাঠে নিজের জায়গা স্থায়ী করে নেন।
লম্বা গড়ন, দৃঢ় ব্যক্তিত্ব এবং হার না মানা মানসিকতার কারণে দ্রুতই বোকা-সমর্থকদের প্রিয় হয়ে ওঠেন রাত্তিন। মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের আক্রমণ থামানোর পাশাপাশি দলের নেতৃত্বও দিতেন সামনে থেকে। ক্লাবটির লড়াকু পরিচয়ের সঙ্গে তার নাম এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে বিদায়ী শ্রদ্ধাঞ্জলির শিরোনামেই বোকা তাকে বলেছে, ‘বোকার আত্মা’।
আর্জেন্টিনার হয়ে ১৯৬২ ও ১৯৬৬ বিশ্বকাপে খেলেছিলেন রাত্তিন। ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ১৯৬৬ বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন দলের অধিনায়ক। সেই আসরের কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার বহিষ্কার বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়।
ওয়েম্বলির সেই ম্যাচের ৩৫ মিনিটে পশ্চিম জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রাইটলাইন তাকে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু তখন হলুদ বা লাল কার্ডের প্রচলন ছিল না। রেফারি স্প্যানিশ জানতেন না, রাত্তিনও জার্মান ভাষা বুঝতেন না। কেন তাকে বের করে দেওয়া হচ্ছে, সেটি বুঝতে দোভাষী চেয়েছিলেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। কয়েক মিনিট মাঠে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদের পর শেষ পর্যন্ত তিনি বেরিয়ে যান।
ইংল্যান্ড ম্যাচের ওই বিভ্রান্তি ফুটবলের শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত আরও পরিষ্কারভাবে প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে আসে। ইংলিশ রেফারি কেন অ্যাস্টন পরে সড়কের হলুদ ও লাল সংকেতবাতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কার্ড ব্যবহারের ধারণা দেন। ১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপ থেকে হলুদ ও লাল কার্ড চালু হয়।
রাত্তিনের বহিষ্কার আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ফুটবল দ্বৈরথের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে আছে। দশজনের আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু ফলের চেয়েও বেশি আলোচিত হয়েছিল রাত্তিনের প্রতিবাদ, দোভাষীর দাবি এবং দীর্ঘ সময় মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানানো।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষে প্রশিক্ষক ও সংগঠক হিসেবেও ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। রাজনীতিতেও কিছু সময় সক্রিয় ছিলেন। তবে আর্জেন্টাইন ফুটবলে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় থেকে গেছে বোকা জুনিয়র্সের নেতৃত্ব, আনুগত্য ও লড়াকু মানসিকতার প্রতীক হিসেবে।
লা বোম্বোনেরার করিডরে অনেক আগেই রাত্তিনের মূর্তি স্থাপন করেছিল বোকা। এবার সেই মাঠেই থেকে যাবে তাঁর স্মৃতি, যেখানে একসময় তাঁর নাম দীর্ঘ করে উচ্চারণ করতেন ঘোষক, আর গ্যালারি থেকে উঠত কানফাটা উল্লাস।
বিদায়বেলায় বোকা জুনিয়র্সের কথাটিই তাই রাত্তিনের জীবনকে সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরে, তিনি শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না, ছিলেন ক্লাবটির আত্মারই একটি অংশ।
সূত্র: বোকা জুনিয়র্স, ফিফা, টিওয়াইসি স্পোর্টস





