তিন বছরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি)-সংলগ্ন আনন্দবাজার এলাকার একটি মেস থেকে ২০২৩ সালের ১৯ জুলাই অর্ধগলিত এক ছাত্রীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর ঠিক তিন বছর পর, গত ২১ জুলাই ক্যাম্পাসের খালপাড় এলাকার একটি ছাত্রাবাস থেকে পুনরায় উদ্ধার করা হয় আরেক ছাত্রের অর্ধগলিত মরদেহ।
এ দুটি ঘটনার মধ্যবর্তী সময়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যুসহ গত তিন বছরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় হারিয়েছে মোট সাতজন শিক্ষার্থী। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর পেছনে সিংহভাগ ক্ষেত্রে প্রেমঘটিত জটিলতা ও ব্যক্তিগত টানাপড়েন কাজ করেছে বলে জানা গেছে।
তিন বছর আগে ২০২৩ সালে বন্ধ ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের (২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থী শাহরিন রিভানা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বর্ষ শেষ করার আগেই ঝরে পড়েন। পিরোজপুরের সোহাগদলের বাসিন্দা রিভানা বিষণ্নতায় (ডিপ্রেশন) ভুগছিলেন বলে পরিবারের বরাতে জানিয়েছিল পুলিশ।
২০২৪ সালের ১৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন কর্ণকাঠির একটি মেস থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী বৃষ্টি রানী সরকারের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আকস্মিক এই সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যক্তিগত টানাপড়েন দায়ী ছিল বলে ধারণা করা হয়। ঘটনার পর তার সহপাঠী ও প্রেমিককে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল।
ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের (২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষ) স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী দেবশ্রী রায়। ২০২৪ সালে স্বামীর সঙ্গে মান অভিমানের জেরে বরগুনায় নিজের বাসায় আত্মহত্যা করেন ১৭ মার্চ। খুলনার পুত্রবধূ ও সাতক্ষীরার মেয়ে দেবশ্রী বরগুনা গার্লস স্কুলের শিক্ষক স্বামীর সঙ্গেই বসবাস করতেন।
একই বছর ৯ জুন খোদ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের তাপসী রাবেয়া বসরি হলের রিডিং রুমের বারান্দা থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী শেফা নূর ইবাদির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সহপাঠীদের মতে, প্রেমিকের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলাকালীন বিবাদের এক পর্যায়ে তিনি এই চরম পথ বেছে নেন।
সেই বছরেই ৬ সেপ্টেম্বর পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের (২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থী সুপর্ণা দাস মেহেন্দিগঞ্জের নিজ বাড়িতে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরদিন শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
পরের বছর ২০২৫ সালের ৪ জানুয়ারি গোপালগঞ্জের বৌলতলীতে নিজ বাড়ি থেকে বাংলা বিভাগের (২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থী শুভ বৈরাগীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মৃত্যুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন পোস্টে শুভ অভিযোগ করেন— প্রেমিকার পরিবারের শারীরিক-মানসিক নির্যাতন ও সামাজিক হেয় প্রতিপন্নের কারণেই তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন।
সর্বশেষ, গত ২১ জুলাই ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের (২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ) প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও খুলনা জেলা ছাত্র কল্যাণ সমিতির সাবেক সভাপতি উচ্ছ্বাস কর্মকারের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একটি বেসরকারি চাকরি ছেড়ে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া চঞ্চল প্রকৃতির এই তরুণের মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি।
শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষার বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমরা এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি, আজও করেছি। উচ্ছ্বাসের মৃত্যুর বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে আমরা বলতে পারব, আসল ঘটনা কী।’ শিক্ষার্থীদের জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই পদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানোগ্রামে আছে কি না, তা দেখতে হবে। যদি না থাকে, তাহলে পদ সৃষ্টি করে নিয়োগ দিতে হবে।’
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুবুর রহমান বাসস আত্মহত্যার বিষয়ে বলেন, ‘শরীরে যেমন অসুখ হয়, তেমনি মনেরও অসুখ হতে পারে। তাই মনকে অবহেলা করা উচিত নয়। যে কোনো সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পরিবারের কেউ মানসিক সমস্যায় ভুগলে তাকে অবহেলা না করে যত্ন ও সহায়তা দিতে হবে। আমাদের দেশে প্রতিবছর ১২ থেকে ১৪ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। সবাই সচেতন হলে এই মৃত্যুগুলো অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে মানসিক রোগের চিকিৎসা এখন অনেক সহজলভ্য। একজন মানসিক রোগী যেন ধীরে ধীরে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত না হন, সে জন্য পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া আত্মহত্যা প্রতিরোধে সাংবাদিকদেরও বড়ো ভূমিকা রয়েছে। জনগণের সামনে আত্মহত্যার ক্ষতিকর দিকগুলো এমনভাবে তুলে ধরতে হবে, যাতে মানসিকভাবে বিপন্ন যে কেউ আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকে না পড়েন।’
.png)






