Advertisement

লজিস্টিকস খাতে বিদেশি মালিকানার সীমা শিথিলের প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবি

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
লজিস্টিকস খাতে বিদেশি মালিকানার সীমা শিথিলের প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবি
ছবি: সংগৃহীত

খসড়া ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং বিধিমালায় বিদেশি মালিকানার সীমা ৪০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪৯ শতাংশ করার প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা ও গবেষকরা।

বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ (সিএসআর) আয়োজিত 'লজিস্টিকস খাতে দেশীয় বিনিয়োগ সুরক্ষা ও নীতি সংস্কার' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ দাবি জানানো হয়।

বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না।

অনুষ্ঠানে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন সিএসআরের নির্বাহী পরিচালক সাকিব আনোয়ার। তিনি বলেন, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং, শিপিং এজেন্সি, কাস্টমস এজেন্ট ও কুরিয়ার-এক্সপ্রেস—এই উপখাতগুলোতে ব্যবসা পরিচালনায় বড় স্থায়ী মূলধন লাগে না। ফলে বিদেশি মালিকানা এখানে কারখানা, যন্ত্রপাতি বা প্রযুক্তি আনে না; কেবল একটি লাইসেন্সের মাধ্যমে বিদ্যমান পণ্যপ্রবাহ তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে সরিয়ে নেয়। এতে বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার বদলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিস্থাপন ঘটছে।

ধারণাপত্রে বলা হয়, বাংলাদেশ বছরে অন্তত ৯ বিলিয়ন ডলার ফ্রেইট বাবদ ব্যয় করে, যার মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ দেশীয় জাহাজ ধরতে পারে। দেশীয় জাহাজ বাড়লে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার দেশে রাখা সম্ভব। বাংলাদেশ পতাকাবাহী জাহাজ (স্বার্থরক্ষা) আইন, ২০১৯ পাসের পর দেশীয় সমুদ্রগামী জাহাজ ৪৮ থেকে ৮০টিতে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে সিভিল এভিয়েশন আইন, ২০১৭-এর ধারা ৯(৪) অনুযায়ী বিদেশি এয়ারলাইনের এজেন্টকে শতভাগ বাংলাদেশি মালিকানাধীন হতে বাধ্য করায় দেশে পূর্ণাঙ্গ দেশীয় জিএসএ শিল্প গড়ে উঠেছে। সাকিব আনোয়ার অভিযোগ করেন, শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন অনেক প্রতিষ্ঠান দেশে থাকলেও তারা দেশীয় জাহাজ বা অবকাঠামোয় কোনো বিনিয়োগ করেনি।

বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, শিপিং এজেন্ট ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বিধিমালা—দুটোতেই দেশীয় ও বিদেশি মালিকানার ৬০/৪০ অনুপাত কমিয়ে ৫১/৪৯ করা হয়েছে। চলতি বাজেটে আইসিডি ও অফ-ডকের ৪৯ শতাংশ সীমা তুলে নেওয়া হয়েছে এবং কুরিয়ার খাতে কোনো সীমাই রাখা হয়নি। ফলে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ের ৬০/৪০ কাঠামোই এখন দেশীয় মালিকানার সর্বশেষ মানদণ্ড। এ ছাড়া শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়নের বৈধতার প্রশ্নটি বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপ্রধীন (রিট পিটিশন নং ১২ ৪৮৯/২০১৯)। এ রুল নিষ্পত্তির আগে বিধি সংশোধন করা হলে তা বিচারপ্রক্রিয়াকে অকার্যকর করে দিতে পারে বলে বক্তারা মত দেন।

লজিস্টিকসকে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবেদনশীল খাত উল্লেখ করে নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বলেন, অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান দৃশ্যমান অবকাঠামো ছাড়াই কেবল বিল অব লেডিংসহ নথি ইস্যুর মাধ্যমে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, আমরা বিদেশি বিনিয়োগের বিরোধী নই। তবে সেই বিনিয়োগ হতে হবে রেলপথ, কোল্ড চেইন, আধুনিক ট্রাক ও কৃষিভিত্তিক সরবরাহব্যবস্থার মতো দৃশ্যমান অবকাঠামোতে। শ্রীলঙ্কা ও ভারতের বিধিনিষেধের উদাহরণ টেনে তিনি আরও বলেন, দেশীয় বাণিজ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত এ খাতকে কৌশলগত গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি আইনজীবী বা পরামর্শকের মাধ্যমে নামমাত্র স্থানীয় অংশীদার দেখিয়ে ব্যবসা পরিচালনার প্রবণতা বন্ধের জোর দাবি জানান তিনি।

আইএইএবির সভাপতি ও বাফার উপদেষ্টা কবির আহমেদ বলেন, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ ফ্রেইট ব্যবসা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও তাদের বড় অংশ প্রত্যাশিত এফডিআই আনে না। বাফা সভাপতি মো. আরিফুল আহসান বলেন, বিদেশি অতিরিক্ত নির্ভরতা অব্যাহত থাকলে দেশের নিজস্ব লজিস্টিকস শিল্প দুর্বল হয়ে পড়বে। দৈনিক ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বৈশ্বিক বাস্তবতার পাশাপাশি ভূরাজনীতি বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, অতিরিক্ত বিদেশি অংশগ্রহণে দেশীয় উদ্যোক্তারা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ খাতে যে লুকোচুরি চলছে, তা নিয়ে আরও বেশি আলোচনার প্রয়োজন। বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি এ টি এম আজিজুল আকিল ডেভিড বলেন, কার্যকর সুদের হার ২৩ থেকে ২৪ শতাংশে পৌঁছানোয় দেশীয় উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ছেন, আর বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো সেই সুযোগ নিচ্ছে।

গোলটেবিল থেকে ছয় দফা দাবি জানানো হয়:

১. চার উপখাতে অভিন্ন ৬০/৪০ কাঠামো নির্ধারণ—শেয়ার, লভ্যাংশ ও পর্ষদের ভোটাধিকার—তিন স্তরেই দেশীয়দের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা।

২. নবায়নে বিদ্যমান বিধির অভিন্ন ও কঠোর প্রয়োগ।

৩. বিদেশি অংশীদারিত্বযুক্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য ৫ থেকে ১০ মিলিয়ন ডলার ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ, যার অন্তত ৪০ শতাংশ ২৪ মাসের মধ্যে ওয়্যারহাউজ, সরঞ্জাম ও পরিবহন-বহরে প্রকৃত বিনিয়োগ হিসেবে দেখাতে হবে।

৪. বিদেশি কর্মী নিয়োগ কেবল ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে সীমিত রাখা।

৫. বৈদেশিক মুদ্রা বহিঃপ্রবাহের মূল্যায়নকে লাইসেন্স নবায়নের পূর্বশর্ত করা।

৬. নামসর্বস্ব মালিকানা দমনে প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানার বাধ্যতামূলক ঘোষণা।

আলোচনায় আরও অংশ নেন সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান, আইসিএবির সাবেক সহসভাপতি মাহমুদ হুসাইন এফসিএ, ব্যারিস্টার এম সাকিবুজ্জামান, ঢাকা স্ট্রিমের কনসাল্টিং এডিটর হাসান মামুন ও রিফলাইন লজিস্টিকসের হেড অব ফিন্যান্স কামরুজ্জামান। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারকরা এই সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন।