Advertisement

রাতভর বালু উত্তোলন/আড়িয়াল খাঁয় বিলীন হচ্ছে বসতভিটা-ফসলি জমি

এশিয়া পোস্ট নিউজ, মাদারীপুর
আড়িয়াল খাঁয় বিলীন হচ্ছে বসতভিটা-ফসলি জমি
একদিকে চলছে বালু উত্তোলন, অন্যদিকে বিলীন হচ্ছে জমি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

মাদারীপুরের আড়িয়াল খাঁ নদীর পাড়ে দাঁড়ালে এখন আর শুধু নদীর স্রোত শোনা যায় না; শোনা যায় ভিটেমাটি হারানো মানুষের দীর্ঘশ্বাস। যে নদী একসময় জীবিকা ও কৃষির প্রাণ ছিল, অবৈধ ড্রেজারের মাধ্যমে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে সেই নদীই এখন গ্রাস করছে মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি আর ভবিষ্যৎ। একের পর এক বসতভিটা, আবাদি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক স্থাপনা বিলীন হয়ে যাচ্ছে নদীগর্ভে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণেই নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বদলে গিয়ে এই ভয়াবহ ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে।

মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের হোগলপাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. এনামুল আকন একসময় প্রায় ১০ বিঘা জমিতে কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন। ১৯৮৮ সালের বন্যার পর ধীরে ধীরে নদী তার জমি গ্রাস করতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত পারিবারিক ভাগে পাওয়া দুই বিঘা জমি ও বসতভিটাও নদীগর্ভে চলে যায়। পরিবার নিয়ে বর্তমানে তিনি অন্যের মাত্র আট শতাংশ জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন।

এনামুল বলেন, ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার পর থেকেই নদী ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। প্রতিবাদ করতেও ভয় লাগে। যারা এসব করছে তারা খুবই প্রভাবশালী। এখন আল্লাহ ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই।

ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

এনামুল একা নন, একই গ্রামের টিটল আকনের জীবনও নদীর ভাঙনে ওলটপালট হয়ে গেছে। গোলাভরা ধান, ফসলি জমি, বসতবাড়ি—সবই হারিয়েছেন তিনি। বাধ্য হয়ে নদীর ওপারে নিজের সামান্য ছয় শতাংশ জমিতে নতুন করে ঘর তুলেছেন।

তার ভাষায়, আগে এই এলাকায় নদীভাঙনের কথা কেউ জানত না। ড্রেজার বসানোর পর থেকেই সব বদলে গেছে। কিন্তু ভয়ে এখানে কেউ মুখ খুলতে পারে না।

আড়িয়াল খাঁ নদী ঘেঁষে ঝাউদি ইউনিয়নের হোগলপাতিয়া, চরহোগলপাতিয়া এবং কালকিনি উপজেলার চর কালকিনি, সস্তাল ও কাদের আকন কান্দিসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন নদীভাঙন নিত্যদিনের বাস্তবতা।

স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছর নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে শত শত একর আবাদি জমি, বসতভিটা, মসজিদ, কমিউনিটি ক্লিনিক ও হাটবাজার। নদীর করাল গ্রাস থেকে রক্ষা পায়নি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। চরহোগলপাতিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ একাধিক শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে শিশুদের লেখাপড়াও চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে। যেসব ঘর এখনো নদীর কিনারায় টিকে আছে, সেসব পরিবারের প্রতিটি রাত কাটে অজানা শঙ্কায়।

স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, বর্ষাকালে নদীর ভয়াবহ ভাঙন আর নৌপথের ঝুঁকির কারণে অনেক সময় তারা স্কুলে যেতে সাহস পায় না।

ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

স্থানীয় বাসিন্দা জলিল বেপারী বলেন, রাতভর ড্রেজারের শব্দে ঘুমাতে পারি না। প্রতিবাদ করলে উল্টো ভয় দেখানো হয়। আরেক বাসিন্দা বিল্লাল হোসাইন অভিযোগ করেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট জড়িত। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।

শাহানুর আকন, সিদ্দিকী আকন, আজম হাওলাদার ও রাজ্জাক হাওলাদারসহ আরও অনেকের অভিযোগ, অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণেই নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনেক পরিবার পাঁচ থেকে সাতবার পর্যন্ত ঘর সরাতে বাধ্য হয়েছে।

ঝাউদি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম আবুল হাওলাদারের চাচাতো ভাই জাফর হাওলাদার জানান, নদীর পাড়ে করা তার বরই ও আমের বাগান নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে। তার দাবি, নদীতীরের মাটি ড্রেজার-সংশ্লিষ্টদের কাছে বিক্রি করায় ভাঙন তীব্র হয়েছে। বাধা দিতে গেলে তাকে মারধরের হুমকি দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে শামীম আকন বলেন, আমি শুধু আমার জমির মাটি বিক্রি করেছি। ড্রেজার আমার নয়। অন্যের জমি ভাঙলে তার দায় আমার ওপর বর্তায় না।

হোগলপাতিয়া ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য লোকমান বেপারী বলেন, যারা এসব করছে তারা অনেক প্রভাবশালী। প্রতিবাদ করলে আমার ওপরও হামলার আশঙ্কা রয়েছে।

কালকিনি উপজেলার আলিনগর ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহিদ পারভেজের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ঝাউদি ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম আবুল হাওলাদার বলেন, নদীভাঙনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। তবে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাননি।

মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী সানাউল কাদের খান জানান, ঝাউদি ইউনিয়নে নদীতীর সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিশেষজ্ঞ দলের পরিদর্শন শেষে অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ পেলে কাজ শুরু হবে।

ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় এক নারী। ছবি: সংগৃহীত
ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় এক নারী। ছবি: সংগৃহীত

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। জরিমানা ও আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে এবং এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে পৃথক ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত থাকবে।