Advertisement

‘মুক্তির’ ১১ বছর/কেমন আছেন বিলুপ্ত ছিটমহলবাসী

এশিয়া পোস্ট নিউজ, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট
কেমন আছেন বিলুপ্ত ছিটমহলবাসী
ছিটমহল বিনিময়ের পর কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ারছড়া জনপদে নির্মিত হয় পাকা সড়ক। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ছিল অবরুদ্ধ ও পরিচয়হীন জীবন। ছিল না শিক্ষা-চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার। জীবনযাত্রায় থাকত কেবল অনিশ্চিয়তা। সব ছাপিয়ে ১১ বছর আগে ৬৮ বছরের রাষ্ট্রহীন ও বন্দিজীবনের অবসান ঘটে।

শনিবার (১ আগস্ট) সেই ঐতিহাসিক দিনের ১১ বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে (১ আগস্টের প্রথম প্রহরে) বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় চুক্তি হয়।

এই ভূমি সীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের অভ্যন্তরে থাকা ১৬২টি ছিটমহলের প্রায় ৫৪ হাজার মানুষ মুক্তির স্বাদ পায়।

চুক্তি অনুযায়ী, ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ১১১টি ছিটমহল ১৭ হাজার ২৫৮ একর জমিসহ বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ৫১টি ছিটমহল ৭ হাজার ১১০ একর জমিসহ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়।

এতে বাংলাদেশে প্রায় ৪০ হাজার এবং ভারতে প্রায় ১৪ হাজার মানুষ নিজ নিজ দেশের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পান।

নাগরিকত্বের স্বীকৃতি, ভোটাধিকার, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক সেবা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলেও বিলুপ্ত ছিটমহলের অনেক বাসিন্দার প্রত্যাশা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ১১১টি বিলুপ্ত ছিটমহলের মধ্যে কুড়িগ্রামে ১২টি, লালমনিরহাটে ৫৯টি, পঞ্চগড়ে ৩৬টি এবং নীলফামারীতে ৪টি অবস্থিত।

বিনিময় চুক্তির এক যুগের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর প্রত্যাশা, নাগরিকত্বের স্বীকৃতির পাশাপাশি উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের পূর্ণ সুফলও যেন তাদের জীবনে বাস্তবে প্রতিফলিত হয়।

বাংলাদেশের লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর সঙ্গে কথা বলেছে এশিয়া পোস্ট। তারা জানান, নাগরিকত্ব পাওয়ার পর সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় কিছু উন্নয়ন হলেও কর্মসংস্থান, বাজার অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে এখনও অনেক ঘাটতি রয়েছে।

ছিটমহল বিনিময়ের পর কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় নির্মিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছিটমহল বিনিময়ের পর কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় নির্মিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বেকারত্ব দূর করতে নির্মিত আইসিটি ভবন দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রমহীন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিল্প বা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ায় অনেক তরুণ এখনও বেকার।

বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর দাবি

দেশের সবচেয়ে বড় বিলুপ্ত ছিটমহল কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ারছড়া জনপদে বর্তমানে প্রায় সাত হাজার মানুষের বসবাস। ছিট বিনিময়ের পর এলাকাটি পার্শ্ববর্তী তিনটি ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তবে ছিটমহলের ইতিহাস ধরে রাখতে দাসিয়ারছড়াকে পৃথক ইউনিয়ন ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

দাসিয়ারছড়া ছিটমহলের বাসিন্দা হাফিজুর রহমান বলেন, আমরা মোটামুটি সব পেয়েছি। এখন আমাদের সবার দাবি দাসিয়ারছড়াকে ইউনিয়ন ঘোষণা করা হোক, এটা হলে আর সরকারের কাছে চাওয়া পাওয়া নেই।

বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, নাগরিকত্ব পাওয়ার মাধ্যমে আমাদের দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রহীন জীবনের অবসান হয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার অনেকটাই এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। দাসিয়ারছড়াকে পৃথক ইউনিয়ন ঘোষণা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি।

কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ বলেন, বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। শিক্ষা, অবকাঠামো ও সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি ভবিষ্যতেও তাদের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

ছিটমহল বিনিময়ের পর লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী এলাকায় নির্মিত পাকা সড়ক। ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছিটমহল বিনিময়ের পর লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী এলাকায় নির্মিত পাকা সড়ক। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আছে উৎসবের আমেজ

মুক্তির এই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে লালমনিরহাটের বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে পালিত হচ্ছে ‘ছিটমহল দিবস’। মোমবাতি প্রজ্বালন ও আতশবাজির মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা করলেও জেলা প্রশাসন কোনো ধরনের আয়োজন করেনি।

পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রামের বিলুপ্ত ছিটমহলবাসী মফিজুল ইসলাম বলেন, ৬৮ বছর আমাদের কোনো দেশের পরিচয় ছিল না। অসুস্থ হলে হাসপাতালে ভুয়া নাম দিয়ে ভর্তি হতে হতো। আজ ১১ বছর ধরে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। বিদ্যুৎ এসেছে, পাকা রাস্তা হয়েছে। শান্তিতে ঘুমাতে পারি, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।

হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী এলাকার লাইলী বেগম বলেন, আগে সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধায় আমাদের অধিকার ছিল না। আজ আমার সন্তানরা নিজেদের পরিচয়ে স্কুলে যাচ্ছে। ঘরের কাছেই ক্লিনিক পেয়েছি, সরকার থেকে ভাতা পাচ্ছি। আমাদের জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে।

পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রামের রমেশ চন্দ্র বলেন, আমাদের পরিচিত অনেকেই ভারতে গেছেন। সেখানে তারা পুনর্বাসিত হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ইন্টারনেটে কথা হলে বলেন—ভিটেমাটির টানের কোনো বিকল্প নেই। আমরা আমাদের নিজ দেশে অনেক শান্তিতে আছি। দীর্ঘ সংগ্রামের পর পাওয়া এই মুক্তজীবনে লালমনিরহাটের সাবেক ছিটমহলবাসী আজ আর কোনো ‘পরবাসী’ নন, বরং মূল ভূখণ্ডের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির সমান অংশীদার হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন।

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) রাশেদুল হক প্রধান বলেন, বিলুপ্ত ছিটমহলের মানুষের এই দিনে শুধু বন্দিদশা থেখে মুক্তি মেলেনি। তারা পেয়েছে নতুন ঠিকানা। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব সময় তাদের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।