Advertisement

রাজনৈতিক সংঘর্ষে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

মোহাম্মদ আব্দুর রউফ, হবিগঞ্জ
রাজনৈতিক সংঘর্ষে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
রাজনৈতিক সংঘর্ষে দৃষ্টিশক্তি হারানো আলিফ মিয়া চৌধুরী। ছবি কোলাজ: এশিয়া পোস্ট

জীবনের শুরু থেকে প্রতিকূলতা পিছু ছাড়েনি ১৯ বছরের মো. আলিফ মিয়া চৌধুরীর। দুর্ঘটনায় শয্যাশায়ী বাবা, দীর্ঘ দিন ধরে অসুস্থ ও মানসিক ভারসাম্যহীন মা, বেকার বড় ভাই–সব মিলিয়ে সংসারে ছিল না কোনো নিয়মিত আয়ের উৎস। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে যে অর্থ আয় করতেন, তা দিয়ে চলত পরিবারের ভরণপোষন। তার সেই লড়াইও এখন থমকে গেছে।

গত ২৮ জুলাই হবিগঞ্জ শহরে রাজনৈতিক সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়ে আলিফ হারিয়েছেন বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। ডান চোখটি দিয়েও ঝাপসা দেখছেন তিনি।

অসুস্থ বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়ানোর যে তরুণটি নিজেই পরিবারের ভরসা হয়ে উঠেছিলেন, এখন তিনিই চিকিৎসা, পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার বাউশা ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের আলিফ বর্তমানে নবীগঞ্জ হোমল্যান্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির নবীগঞ্জ উপজেলা শাখার সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক।

প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন আলিফের বাবা আব্দুর শহীদ চৌধুরী। এরপর থেকে তিনি শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে শয্যাশায়ী। মা আতিকা বেগম দীর্ঘ দিন ধরে অসুস্থ এবং মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছেন।

দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আলিফ সবার ছোট। বড় দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বড় ভাই আতিক চৌধুরী সহজ-সরল প্রকৃতির এবং বর্তমানে বেকার। ফলে পরিবারটির স্থায়ী কোনো আয়ের উৎস নেই।

এমন পরিস্থিতিতে পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করতেন আলিফ। নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি সেই অর্থ দিয়ে বাবা-মায়ের সংসারেও সহযোগিতা করতেন। সামান্য আয়ে চললেও পরিবারটির কাছে আলিফই ছিল অন্যতম প্রধান ভরসা।

আলিফের পরিবারের খোঁজ নিতে যান এনসিপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা। শুক্রবার হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার বাউশা ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামে আলিফের বাড়িতে। ছবি: এশিয়া পোস্ট
আলিফের পরিবারের খোঁজ নিতে যান এনসিপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা। শুক্রবার হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার বাউশা ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামে আলিফের বাড়িতে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

প্রতিবেশী শিব্বির আহমদ বলেন, যে ছেলে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে টিউশনি করে অসুস্থ বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, এখন সেই ছেলেই চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। একদিকে চিকিৎসার খরচ, অন্যদিকে পরিবারের আয়ের পথ বন্ধ। পরিবারটি এখন চরম দুশ্চিন্তায় পড়বে।

স্থানীয় বাউশা ইউনিয়ন পরিষদের নারী সদস্য মরিয়ম বেগম বলেন, আলিফের পরিবারের অবস্থা খুবই খারাপ। তার বাবা পঙ্গু হয়ে চলাফেরা করতে পারেন না। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তাকে প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়া হয়। আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় কোনোমতে সংসার চলে। আলিফের এই অবস্থায় পরিবারটি আরও অসহায় হয়ে পড়বে।

গত ২৮ জুলাই এনসিপির কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ ও জেলা সদরে ‘জুলাই জাগরণ পদযাত্রা’ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। আজমিরীগঞ্জের কর্মসূচিতে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর বক্তব্য কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়।

জেলা সদরে কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে হবিগঞ্জ শহরের কোর্ট মসজিদ এলাকায় এনসিপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এতে এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। ওই সংঘর্ষের সময় বাম চোখে তীব্র আঘাত পান আলিফ।

প্রথমে আলিফকে হবিগঞ্জ জেলা সদর আধুনিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে নেওয়া হয় সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বর্তমানে ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে আলিফকে।

সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রেসক্রিপশন। ছবি: এশিয়া পোস্ট
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রেসক্রিপশন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আলিফের বড় ভাই আতিক চৌধুরী বলেন, আলিফের চোখের অবস্থা ভালো না। ডান চোখ দিয়ে ঝাপসা দেখে। সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা হচ্ছে ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে। মামলা হয়েছে, কিন্তু এখনও কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি।

আলিফের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নবীগঞ্জ হোমল্যান্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সৈয়দ আবু তাহের বলেন, আলিফ এসএসসিতে ভালো ফল করেছে। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর নিয়মিত ক্লাস করতে পারছে না। তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় কলেজের পক্ষ থেকে তার পড়ালেখার সব ব্যয় আমরা বহন করছি।

তিনি বলেন, তার এই দুর্ঘটনায় আমরা কলেজ কর্তৃপক্ষ খুবই মর্মাহত। যেহেতু রাজনৈতিক একটি কর্মসূচিতে গিয়ে এমন ঘটনা ঘটেছে, তাই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অনেক কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আলিফ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক। এটাই আমাদের কামনা।

জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) নাহিদ উদ্দিন তারেক বলেন, আমাদের সংগঠন ও নেতাকর্মীরা আলিফের পাশে সার্বক্ষণিক রয়েছেন। তার চিকিৎসার ব্যয় বহন করছে এনসিপি। যারা তার চোখের এ অবস্থার জন্য দায়ী, তারা গ্রেপ্তার না হওয়ায় আমরা উদ্বিগ্ন।

সংঘর্ষের ঘটনার পরদিন একই এলাকায় উভয় পক্ষ বিক্ষোভ সমাবেশের ঘোষণা দিলে জেলা প্রশাসন পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। এ ঘটনায় জাতীয় যুবশক্তি হবিগঞ্জ জেলার আহ্বায়ক তন্ময় তাহের রুবেল বাদী হয়ে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহ রাজিব আহমেদ রিংগনকে প্রধান আসামি করে ১১ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০০ জনের বিরুদ্ধে হবিগঞ্জ সদর থানায় মামলা করেন।

একদিন পর জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইকবাল হোসেন রুকন বাদী হয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী, সারজিস আলমসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৪০ থেকে ৫০ জনের বিরুদ্ধে হবিগঞ্জ সদর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন।

হবিগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল হক বলেন, এনসিপির পক্ষ থেকে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও একটি অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। উভয় বিষয় গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছে পুলিশ।

বিষয় :হবিগঞ্জ