চট্টগ্রাম নগরে জলাবদ্ধতা কমলেও উপজেলাতে বন্যার অবনতি

মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা কিছুটা কমলেও জেলার বিভিন্ন উপজেলা, পার্বত্য অঞ্চল ও কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। চকরিয়ায় পাহাড়ধসে দুই ভাইবোনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ২১৪ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
টানা বৃষ্টিতে সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ডলু, টঙ্কাবতী, মাইনী ও চেঙ্গী নদীর পানিও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
ছুটি বাতিল, প্রস্তুত ৬২৯ আশ্রয়কেন্দ্র
দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের প্রস্তুতির কথা তুলে ধরে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, প্রতিটি উপজেলায় পৃথক কন্ট্রোল রুম এবং জেলা প্রশাসনের কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম ২৪ ঘণ্টা চালু রয়েছে। সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটিসহ সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁশখালী ও সাতকানিয়ার জন্য ১০টি স্পিডবোট প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
নগরে জলাবদ্ধতা কমলেও দুর্ভোগ শেষ হয়নি
চট্টগ্রাম নগরে সকাল থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমেছে; সেই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় জমে থাকা পানিও নামতে শুরু করেছে। বিকেলের দিকে নগরীর ওয়াসা, জিইসি মোড়, প্রবর্তক মোড়, কাজীর দেউড়ি ও দেওয়ানহাট এলাকা ঘুরে কোথাও পানি দেখা যায়নি। তবে সড়কের পানি নেমে গেলেও নিচু এলাকার ঘরবাড়িতে পানি আটকে থাকায় বাসিন্দারা চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। পতেঙ্গা ও চান্দগাঁও এলাকায় এখনো পানিবন্দি আছেন কয়েক হাজার মানুষ।
বাঁশখালীতে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি
বাঁশখালীতে টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের প্রভাবে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কাথারিয়া, খানখানাবাদ, গুনাগরী, বাহারছড়া, জলদিসহ অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পাঁচ শতাধিক মাটির ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষিজমি, আমনের বীজতলা ও মাছের ঘের তলিয়ে যাওয়ায় শতকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রায় ৬০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বিশুদ্ধ পানি ও শিশুখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
এদিকে, বৈলছড়ি ইউনিয়নের চেচুরিয়ায় পানিবন্দি একটি পরিবারকে উদ্ধার করতে গিয়ে আট মাস বয়সী এক শিশুকে বড় পাতিলে বসিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, উপজেলায় ১১০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সাঙ্গু ও ডলুর পানি লোকালয়ে
সাতকানিয়ায় সাঙ্গু ও ডলু নদী এবং স্থানীয় খালের পানি বেড়ে বাজালিয়া, কেঁওচিয়া, ছদাহা, খাগরিয়াসহ প্রায় সব নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোথাও নৌকাই এখন একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। বন্যা পরিস্থিতির কারণে উপজেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা দুই দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। সাতকানিয়ার বাসিন্দা এজিএম জিহান বলেন, তিন দিন ধরে কারেন্ট নাই, আমরা পানিবন্দি। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানি ঘটেনি, এটাই স্বস্তি। এছাড়া লোহাগাড়ায় ডলু নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয় প্লাবিত হয়েছে।
খাগড়াছড়িতে সড়ক বিচ্ছিন্ন, বিদ্যুৎহীন সাজেক
চেঙ্গী ও মাইনী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, মহালছড়ি ও সদরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। দীঘিনালা-লংগদু, দীঘিনালা-সাজেক এবং খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বন্যার পানিতে দীঘিনালা ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র তলিয়ে যাওয়ায় দীঘিনালা ও সাজেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
চকরিয়ায় পাহাড়ধসে ২ মৃত্যু, পেকুয়ায় লাখো মানুষ পানিবন্দি
কক্সবাজারের চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়ায় মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়ে ব্যাপক বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নে পাহাড়ধসে দুই ভাইবোনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ফটিকছড়ি, রাউজান, হাটহাজারী, মিরসরাই ও আনোয়ারার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলেও পানি ঢুকে মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এছাড়া সন্দ্বীপে আকস্মিক টর্নেডোর আঘাতে মগধরা ছোয়াখালী এলাকার ৩০টি দোকান ও বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।





