জঙ্গল সলিমপুরের ৭০ একরে হচ্ছে অত্যাধুনিক কারাগার

এশিয়া পোস্ট নিউজ, চট্টগ্রাম
জঙ্গল সলিমপুরের ৭০ একরে হচ্ছে অত্যাধুনিক কারাগার
জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পাহাড় কেটে বানানো হয়েছে বসতি। ছবি : সংগৃহীত

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড় ঘেরা জঙ্গল সলিমপুর, যা একসময় পরিচিত ছিল ‘রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র’ হিসেবে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর একক আধিপত্য, পাহাড় কাটা আর দেড় লাখেরও বেশি বাসিন্দাকে জিম্মি রাখার সেই অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে এবার সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে দেশের অন্যতম অত্যাধুনিক কারাগার। অপরাধের সেই প্রাচীন অভয়ারণ্যকেই এবার রূপান্তর করা হচ্ছে অপরাধ সংশোধন ও পুনর্বাসনের একটি আধুনিক কেন্দ্র হিসেবে।

পাহাড়ি অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে প্রায় ৭০ একর জমির ওপর এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, কারাগারটি নির্মিত হলে সেখানে চট্টগ্রাম মহানগর আদালতে বিচারাধীন প্রায় দুই হাজার আসামিকে স্থানান্তর করা হবে। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের বর্তমান অবকাঠামোটি প্রায় ১৪০ বছরের পুরোনো। ব্রিটিশ আমলে তৈরি চট্টগ্রাম কারাগারে ২২৪৯ জন বন্দির ধারণক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে ৬ হাজার ৩৩৮ জন বন্দি আছে, যা ধারণক্ষমতার প্রায় তিনগুণ।

জানা গেছে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী এবং চট্টগ্রাম মহানগরের বায়েজিদ বোস্তামী, পাহাড়তলী ও খুলশী এলাকার সীমান্তবর্তী এক দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল। এই কৌশলগত সুবিধার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি ছিল দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও বিভিন্ন অপরাধী চক্রের নিরাপদ আস্তানা। বিগত দিনে এই এলাকায় একাধিক উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যাপক বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। এমনকি সেখানে অভিযান পরিচালনাকালে র‍্যাব সদস্যদের ওপর সশস্ত্র হামলা এবং কুপিয়ে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটিয়েছে অপরাধী চক্র। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সুপরিকল্পিত ও কঠোর অভিযানের পর এলাকাটি এখন সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

প্রথাগত জেলখানা নয়, লক্ষ্য ‘সংশোধন ও পুনর্বাসন’

কারা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরের এই নতুন প্রকল্পটি কেবল বন্দি আটকে রাখার প্রথাগত কোনো চার দেয়ালের জেলখানা হবে না। আধুনিক বিশ্বের উন্নত কারাগারগুলোর আদলে এটিকে একটি পরিপূর্ণ ‘সংশোধনাগার’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। বন্দিদের আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন কারিগরি ও আইটি প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। নিরক্ষর ও স্বল্পশিক্ষিত বন্দিদের জন্য থাকবে সীমিত পরিসরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা। শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য থাকবে পর্যাপ্ত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরাধীরা যেন বন্দিজীবন শেষ করে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর হতে পারেন এবং মুক্তির পর পুনরায় অপরাধে না জড়িয়ে সমাজে বুক ফুলিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন, সেটিই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড় ও পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে, পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে এই কারাগার নির্মাণের বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরা।

চট্টগ্রামের হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে যদি পরিকল্পিতভাবে এই কারাগার নির্মাণ করা হয়, তবে এটি মানবাধিকার রক্ষা এবং অপরাধী সংশোধনের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত যুগান্তকারী একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ হবে। শাস্তি নয়, অপরাধীকে সংশোধন করার এই বৈশ্বিক দর্শন এখানে বাস্তবায়িত হবে বলে আমরা আশা করি।

কারা প্রশাসন জানিয়েছে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের চূড়ান্ত অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই আধুনিক কারাগারের দৃশ্যমান নির্মাণকাজ শুরু হবে। অপরাধের চারণভূমি জঙ্গল সলিমপুর সুশাসনের এক নতুন মডেল হতে যাচ্ছে।

কারা কর্তৃপক্ষের ডিআইজি (প্রিজন) মো. ছগির মিয়া বলেন, নতুন এই কারাগারটি নির্মিত হলে সেখানে চট্টগ্রাম মহানগর (মেট্রো) এলাকার হাজতি ও কয়েদিদের রাখা হবে। এতে করে জেলা ও মহানগরের বন্দিদের আলাদা রাখা সম্ভব হবে। এই বিভাজন সামগ্রিক কারা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের শৃঙ্খলা ও গতিশীলতা আনবে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া বলেন, বর্তমান কারাগারটি অতিরিক্ত বন্দির চাপে প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ধারণক্ষমতার চেয়ে তিনগুণ বেশি বন্দি থাকায় সেখানে একধরনের ওভারলোড পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম একটি মেগাসিটি, তাই এই মহানগরের ভবিষ্যৎ ও বর্তমান প্রয়োজন বিবেচনা করেই একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের কারাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে জঙ্গল সলিমপুরের ৭০ একর পাহাড়ি জমি কারা অধিদপ্তরের অনুকূলে বরাদ্দের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।