এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে ৪৫ বছর ধরে শিক্ষকতা

এক হাতে লাঠি, আরেক হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল। একটি পা অকার্যকর হওয়ায় অন্য পায়ের জোরে সাইকেল চালান তিনি। প্রতিদিন এভাবে বেড়া পৌর এলাকার এক মহল্লা থেকে আরেক মহল্লায় ছুটে যান। কোনো শিক্ষার্থীর বাড়িতে এক ঘণ্টা, কোথাও দেড় ঘণ্টা। তারপর আবার সাইকেলে চেপে পরের গন্তব্যে। এভাবে কেটে গেছে চার দশকেরও বেশি সময়।
পাবনার বেড়া পৌর এলাকার বাসিন্দা মোক্তার হোসেন প্রায় ৪৫ বছর ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন। পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে শৈশবে ডান পা অকার্যকর হয়ে যায়। ডান হাতও পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার জীবনযুদ্ধের পথ আটকে রাখতে পারেনি।
তার বয়স যখন পাঁচ বছর, তখন পোলিওতে আক্রান্ত হন। এরপর থেকে ডান পা প্রায় অকেজো হয়ে যায়। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। চলাফেরার জন্য একটি ক্র্যাচ কেনার সামর্থ্যও ছিল না। একটি লাঠির ওপর ভর করে স্কুলে যেতেন।
তিনি পড়াশোনায় ভালো ছিলেন। স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ করে সরকারি চাকরি করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করার পর সংসারের দায়িত্ব অনেকটা তার কাঁধে এসে পড়ে। তিন ভাই ও আট বোনের বড় পরিবারে অভাব-অনটনের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি।
সংসারের খরচ মেটাতে প্রথমে একটি ছোট মুদি দোকান দেন। পরে অবসরে এলাকার কয়েকজন শিশুকে পড়ানো শুরু করেন। সেই শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল দেখে ধীরে ধীরে তার কাছে শিক্ষার্থী বাড়তে থাকে। একসময় দোকান ছেড়ে পুরোপুরি গৃহশিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন।
তবে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়ানো সহজ ছিল না। লাঠির ভর দিয়ে দীর্ঘ পথ হাঁটা কষ্টসাধ্য ছিল, আবার নিয়মিত রিকশায় চলার সামর্থ্যও ছিল না। তখন তিনি একটি সাইকেল চালানো শেখার সিদ্ধান্ত নেন।
শুরুতে অনেকবার পড়ে গেছেন। ভারসাম্য রাখতে পারেননি। তবু হাল ছাড়েননি। একসময় এক পায়ে সাইকেল চালানো শিখে ফেলেন। এরপর থেকেই সেই সাইকেলই হয়ে ওঠে তার জীবনযুদ্ধের সঙ্গী।
প্রতিদিন লাঠি সঙ্গে নিয়ে এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি যান। গন্তব্যে পৌঁছে লাঠির ভরেই হাঁটেন। বয়স বেড়েছে, শরীরও আগের মতো সাড়া দেয় না। তবু শিক্ষকতা ছাড়েননি।
মোক্তার হোসেনের পরিবারে এক ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ে। দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও ধারদেনা করে সম্প্রতি ছেলেকে সিঙ্গাপুরে শ্রমিকের কাজে পাঠিয়েছেন। পরিবার নিয়ে এখনো একটি টিনের ঘরেই বসবাস করেন।

মোক্তার হোসেন বলেন, সংসারের দায়-দায়িত্বের কারণেই পড়াশোনা শেষ করতে পারিনি। এরপর টিউশনি শুরু করি। আমার পড়ানো শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করায় অন্যরাও সন্তানদের পড়ানোর জন্য নিয়ে আসে। এই টিউশনিই আমার পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস।
তিনি বলেন, এখন বয়স হয়েছে। আগের মতো কষ্ট করতে পারি না। সরকার থেকে শুধু প্রতিবন্ধী ভাতা পেয়েছি। যদি আর একটু সহযোগিতা পেতাম, তাহলে পরিবার নিয়ে কিছুটা স্বস্তিতে থাকতে পারতাম।
মোক্তার হোসেনের স্ত্রী হেলেনা খাতুন বলেন, বিয়ের পর থেকেই কষ্ট করে সংসার করছি। দোকান করেছেন, ব্যবসাও করেছেন। শেষ পর্যন্ত টিউশনির ওপরই সংসার টিকে আছে। তারপরও স্বপ্ন নিয়ে আমাদের সংসার চলে যাচ্ছে। কোনো অভিমান ও রাগ নেই। সর্বদিকে থেকে আলহামদুলিল্লাহ।
স্থানীয় বাসিন্দা আলাউদ্দিন মালিথা বলেন, উনার জীবন অনেক সংগ্রামের। কষ্ট করেই সংসার চালিয়ে যাচ্ছে। সেই কতকাল থেকে দেখছি সাইকেল চালিয়ে গ্রামে গ্রামে প্রাইভেট পড়িয়ে বেড়ায়। সে আর কত সংগ্রাম ও কষ্ট করে যাবে। তার একটা গতি হওয়া দরকার।
তার ভাতিজা স্বপন মিয়া বলেন, ছোটবেলা থেকেই চাচাকে লাঠির ভর দিয়ে চলাফেরা করতে দেখছি। কয়েক বছর ধরে এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়ান। সরকার যদি তাকে সহযোগিতা করে, তাহলে অনেক উপকার হবে।
বিষয়ে বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুনাল্ট চাকমা বলেন, বিষয়টি তার জানা ছিল না। সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানা হয়েছে। খোঁজখবর নিয়ে সরকারিভাবে সহায়তার ব্যবস্থা করা যায় কিনা দেখা হবে। তিনি বলেন, সমাজের এমন সংগ্রামী মানুষদের পাশে দাঁড়ানো সবার দায়িত্ব। সরকারের একার পক্ষে অনেক সময় সম্ভব হয়ে উঠে না। প্রতিবন্ধকতা থাকে।
.png)






