বাবা-ছেলের কোরবানির গল্প

ইবরাহিম (আ.) একসময় মাতৃভূমি ইরাকের ব্যাবিলন ছেড়ে শামের কানআনে চলে আসেন। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী সারা (আ.) ও হাজেরা (আ.)। এরপর কিছুদিন থাকেন মিসরে। সেখানে ধনসম্পদ, আসবাবপত্র ও পশুর বড় বড় পাল ছিল তাঁর। ঘটনাচক্রে আবার ফিরে আসেন শামে। এখানে এসে আল্লাহর কাছে সৎ সন্তান চাইলেন। কেঁদে কেঁদে দোয়া করলেন। হাজেরা (আ.)-এর কোলজুড়ে তাঁর ঘর আলাকিত করে জন্ম হয় ইসমাইল (আ.)-এর। তখন ইবরাহিম নবীর ৮৬ বছর। ঘরভরা আলো আর আলোভরা ঘরে আদর-আহ্লাদে বড় হতে থাকেন দুধের শিশু ইসমাইল (আ.)। তাঁকে দেখে প্রাণজুড়ায় ইবরাহিম ও হাজেরার। এর মধ্যে আল্লাহর নির্দেশ আসে হাজেরা ও দুধের শিশু ইসমাইলকে নির্জন মরুপ্রান্তরে রেখে আসার।
ইবরাহিম (আ.) তাই করলেন। প্রিয় স্ত্রী ও আত্মার ধন নিয়ে চললেন বিজন মরুভূমির পথে। পথ চলতে চলতে ভাবনায় আসা সব মায়া আর চিন্তা ম্লান হয়ে যায় প্রিয়বন্ধুর আদেশে। মক্কা শরিফের ফারান পর্বতের কাছে এলেন। কাবাঘরের কাছে একটি গাছের নিচে দুজনকে রাখলেন। এখানে মানুষ নেই। পানির ব্যবস্থা নেই। পাখির কোলাহল নেই। চারদিকে বিজন মরুভূমি, উচুঁ-নিচু টিলা আর পাহাড়। একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর আর একটি মশকে পানি দিয়ে সেখানেই তাঁদের রেখে ইবরাহিম (আ.) ফিরে চললেন।
হাজেরা (আ.) বেশ দুশ্চিন্তা আর ভয়ের মধ্যে পড়ে গেলেন। এই দুধের শিশু নিয়ে বিজন ভূমিতে কীভাবে থাকবেন। তার ভেতরটা কেমন কেমন করতে লাগল। তিনি বেদনা বিস্মৃত হয়ে ব্যাকুলভাবে স্বামীর পিছু পিছু এসে বারবার বলতে লাগলেন, ইবরাহিম, আপনি আমাদের এখানে এভাবে রেখে কোথায় যাচ্ছেন? এখানে তো মানুষ নেই। সাহায্যকারী নেই। কোনো কিছুর ব্যবস্থাও নেই। নবী ইবরাহিম নিরুত্তর। স্ত্রীর দিকে তাকালেন না। হাজেরা তাকে বললেন, আল্লাহই কি আপনাকে এ আদেশ দিয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। হাজেরা (আ.) আর কথা বাড়ালেন না। স্বামীকে ডাকলেন না। বললেন, আমাদের আল্লাহ আছেন। তিনিই যথেষ্ট আমাদের জন্য। (কাসাসুল কোরআন, মাওলানা হিফজুর রহমান, অনুবাদ: আব্দুস সাত্তার আইনী, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৫২)
ইবরাহিম (আ.) পেছনে রেখে যাওয়া স্ত্রী-ছেলের দিকে ফিরে তাকালেন না। সামনে এগিয়ে চললেন। যেতে যেতে গিরিপথের বাঁকে পৌঁছলেন। সেখান থেকে আর স্ত্রী-ছেলেকে দেখতে পেলেন না। কাবাঘরের দিকে মুখ করে আল্লাহর কাছে দুহাত তুললেন। দোয়া করলেন স্ত্রী-সন্তানের জন্য। বললেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক, তোমার পবিত্র ঘরের কাছে এমন এক ময়দানে আমার স্ত্রী ও ছেলেকে রেখে যাচ্ছি, যা (অনাবাদি) শস্যের অনুপযোগী এবং জনশূন্য (নির্জন প্রান্তর) মরুভূমি। হে প্রভু, এ উদ্দেশ্যে (তাদের উভয়কে রেখে যাচ্ছি) যে, তারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করবে। অতএব তুমি লোকদের মনকে এ দিকে আকৃষ্ট করে দাও এবং প্রচুর ফল ফলাদি দিয়ে এদের রিজিকের ব্যবস্থা করে দাও। তারা যেন তোমার শুকরিয়া আদায় করতে পারে।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৩৭)
মা হাজেরা ছেলে ইসমাইল (আ.)-কে নিয়ে জনমানবহীন এই মরুপ্রান্তরে একাকী জীবন শুরু করলেন। এখানে মানুষ নেই, এখানে কেউ থাকে না। কেউ আসেও না। দূরের সফরে কিংবা ব্যবসায় বের হওয়া কোনো কাফেলাও এ পথ ধরে না। পাখিরা এখানে উড়ে বেড়াতে আসে না। কোনো বন্যপ্রাণীরও বিচরণ নেই বসবাস অনুপোযোগী এই প্রান্তরে।
মা হাজেরা ছেলেকে স্তন্যের দুধ পান করাতেন। তিনি নিজে খেতেন থলের খেজুর এবং মশক থেকে পানি। খেজুর আর পানি একসময় ফুরিয়ে গেল। তিনি আর তাঁর দুগ্ধপোষ্য শিশুপুত্রের পিপাসা বাড়তে থাকে। একসময় তাঁরা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়েন। তিনি দেখলেন, তৃষ্ণায় ছেলে ছটফট করছে। কান্নাকাটি করছে। শিশুপুত্রের এ করুণ অবস্থায় তার পেরাশানি বেড়ে যায়। তিনি আর সহ্য করতে পারছিলেন না। তাঁর ভেতরটা সন্তানের জন্য ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। চরম অস্থিরতা আর হাহাকারে নিজের মধ্যে তীব্র ধড়ফড়ানি বেড়ে চলছে। তিনি পানির খুঁজে সন্ধানী কাতর চোখ বুলালেন এদিক-সেদিক। পানির খুঁজে কাছের সাফা পর্বতে গেলেন। ওপরে উঠলেন। ময়দানের দিকে তাকালেন। এদিক-সেদিক দেখলেন। কোথাও যদি পানির খোঁজ পাওয়া যায়। যদি কোনো মানুষকে দেখা যায়। যার কাছে পাওয়া যাবে এক কাৎরা পানি কিংবা সামান্য খাবার। তিনি কোথায় পানির খোঁজ পেলেন না। কাউকে দেখতে পেলেন না। সাফা পর্বত থেকে নেমে নিচের ময়দানে পৌঁছালেন তিনি। যাবেন মারওয়া পাহাড়ে। দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থান ছিল কিছুটা সমতল। ফলে পাহাড় থেকে নামার সময় শিশু ইসমাইলকে দেখা যেত। যখনই দুই পাহাড়ের পাদদেশে সমতল ভূমিতে যেতেন তখন আর তাঁকে দেখা যেত না। এ কারণে হাজেরা সমতল স্থানটা দ্রুত অতিক্রম করতেন। ময়দান পার হয়ে এক সময় মারওয়া পাহাড়ের ওপর উঠে এলেন। এদিক-সেদিক তাকিয়ে দেখলেন কাউকে পাওয়া যায় কিনা। লাভ হলো না। এভাবে তিনি সাতবার দৌড়াদৌড়ি করলেন। (ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন যে নবী (সা.) বলেছেন, এ জন্যই মানুষ এ পর্বত দুটোর মাঝখানে সাঈ করে থাকে।)
সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সপ্তম বা শেষবার ছুটতে থাকা অবস্থায় শিশু ইসমাইলের দিকে তাকিয়ে দেখতে পান, তাঁর পায়ের কাছ থেকে পানির ফোয়ারা বয়ে যাচ্ছে। তিনি ছুটে এলেন। ছেলেকে অসীম মমতায় কোলে তুলে নিলেন এবং আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করলেন। পানির উৎসের চারদিকে বাধ দিয়ে পানি আটকাতে লাগলেন। এক চৌবাচ্চার মতো হলো চারপাশটা। মশক ভরে নিলেন। ছেলেকে পানি পান করালেন এবং নিজেও পান করলেন। এ ছিল জমজমের পানি। জান্নাত থেকে আসা চিরবহমান পানির স্রোতধারা। এ পানি হজরত জিবরাইল (আ.)-এর পা অথবা ডানার আঘাতে সৃষ্টি হয়েছিল। এ সময় তিনি অদূরে একটি আওয়াজ শুনে চমকে উঠেন। এ আওয়াজ জিবরাইল (আ.)-এর। তিনি বললেন, আপনি ভয় পাবেন না। ধ্বংসের শঙ্কা করবেন না। এখানে আছে আল্লাহর ঘর। এই শিশুটি আর তাঁর পিতা মিলে এখানে ঘর তুলবে। আল্লাহ তাঁর আপনজনকে কখনো ধ্বংস করেন না।
শিশু ছেলেকে নিয়ে শুরু হলো হাজেরা (আ.)-এর নতুন জীবনের শুভসূচনা। পানি দেখে পাখি এলো। পাখির ওড়াউড়ি দেখে ভিন্নপথ ধরে যাওয়া ব্যবসায়ী কাফেলা এলো। পানি দেখে বিপুল আশ্চর্য হলো তারা। তারা হাজেরার কাছে পানি ব্যবহারের অনুমতি চাইল। তিনি এখানে বসতি স্থাপনের শর্তে পানি ব্যবহারের অনুমতি দিলেন। বিনা পয়সায় এ প্রস্তাব পেয়ে তারা খুশিমনে গ্রহণ করল। অল্প কিছুদিনের মধ্যে জনমানবহীন মরুভূমি জনবসতিতে গড়ে উঠল। ব্যবসায়ীরা ছিল ইয়েমেন থেকে আগত বনু জোরহাম গোত্রের লোক। ইসমাইল বড় হয়ে এ গোত্রে বিয়ে করেন। এরাই কাবাঘরের খাদেম হন। এ গোত্রের শাখা গোত্র কুরাইশ বংশে মুহাম্মাদ (সা.)-এর জন্ম হয়। (তাফসিরে মারিফুল কোরআন, মুহাম্মাদ ইদরিস কান্ধলভী, অনুবাদ: মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল হালীম, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৭০৫)
এদিকে ইবরাহিম (আ.) বোরাকে চড়ে মাঝেমধ্যেই স্ত্রী ও সন্তাকে দেখতে মক্কায় আসতেন। সেসময় ইসমাইলের (আ.) সাত কিংবা সতেরো বছর। বাবার সঙ্গে চলতে পারেন। দৌড়াতে পারেন। শাম থেকে স্ত্রী-সন্তানকে দেখতে এলেন। তখন তিনি টানা তিন রাত স্বপ্ন দেখেন, তার এই সন্তানকে জবাই করছেন। প্রথমে রাতে স্বপ্ন দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন। পরে টানা স্বপ্ন দেখে সন্তানকে জবাই করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন। ছেলেকে স্বপ্নের কথা বললেন। অভিমত জানতে চাইলেন। ছেলে বললেন, আল্লাহর নির্দেশ নির্দ্বিধায় পালন করুন আপনি। আপনি দেরি করবেন না। আমাকে ধের্যশীলদের একজন পাবেন ইনশাআল্লাহ। দুজনই আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণভাবে নিবেদিত হয়ে নিজেদের সমর্পণ করলেন। (কাসাসুল কোরআন, মাওলানা হিফজুর রহমান, অনুবাদ: আব্দুস সাত্তার আইনী, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৬২)
একদিন পিতা ইবরাহিম (আ.) চললেন সন্তানকে উৎসর্গ করতে, সন্তান ইসমাইলও আল্লাহর পথে উৎসর্গিত হতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ইসমাইল বললেন, আব্বা, আমাকে উপুড় করে শুইয়ে দিন, আমার চেহারা দেখলে আপনার পিতৃস্নেহ জাগবে। তখন আল্লাহর আদেশ পালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। মাকে আমার সালাম দেবেন। ইবরাহিম ছেলেক কাত করে শুইয়ে দিলেন। গলায় চালাতে লাগলেন ছুরি। কিন্তু ছুরি গলা কাটতে পারছিল না। ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ তাআলা ইসমাইলকে নিরাপদ রাখলেন। তার পরিবর্তে ভেড়া জবাইয়ের নির্দেশ আসে। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘হে আমার প্রতিপালক, তুমি আমাকে এক সৎকর্মশীল ছেলে সন্তান দান করো। এরপর আমি তাকে এক অতি ধৈর্যশীল ছেলের সুসংবাদ দিলাম। সে যখন তার পিতার সঙ্গে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছল, তখন ইবরাহিম বলল, ‘ছেলে, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবাই করছি, এখন বল, তোমার অভিমত কী? সে বলল, ‘হে পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন, আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন। দুজই যখন আনুগত্যে মাথা নুইয়ে দিল। আর ইবরাহিম তাকে উপুড় করে শুইয়ে দিল। তখন আমি তাকে ডাক দিলাম, ‘হে ইবরাহিম, স্বপ্নে দেওয়া আদেশ তুমি সত্যে পরিণত করেই ছাড়লে। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি।’ (সুরা সাফফাত, আয়াত: ১০০-১০৫)। তখন তিনি পেছনে ফিরে একটি দুম্বা দেখতে পেলেন। যার শিং ছিল বড় বড় এবং চোখ দুটি ছিল অতি সুন্দর। এটি ছিল জান্নাতের দুম্বা।
ইবরাহিম (আ.) ফিলিস্তিনে থাকলেও মন পড়ে থাকত মক্কায়। মক্কার নির্জন মানুষহীন মরুভূমিতে। স্ত্রী ও কলিজার ধন ছেলের কাছে। তাদের প্রায়ই তিনি দেখতে আসতেন। এর মধ্যে তিনি কাবাঘর নির্মাণের আদেশ পেলেন। ইবরাহিম (আ.) ছেলের সঙ্গে আলোচনা করলেন। শুরু করলেন কাবাঘর নির্মাণের কাজ। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘ইবরাহিম ও ইসমাইল (আ.) কাবাঘর নির্মাণ করছিলেন, তখন তাঁরা ঘরের তুলনায় কাবার ভিটি উঁচু করেন। ইসমাইল (আ.) পাথর নিয়ে আসছিলেন এবং ইবরাহিম (আ.) তা দিয়ে নির্মাণ করছিলেন। যখন দেয়াল উঁচু হয়ে গেল, তখন ইসমাইল (আ.) ইবরাহিম (আ.)-এর জন্য এই পাথরটি নিয়ে এলেন, যেন তিনি তাঁর ওপর দাঁড়িয়ে নির্মাণকাজ করতে পারেন। তাঁরা উভয়ে দোয়া করেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের পক্ষ থেকে কবুল। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৭)






