পণ্যের বিক্রি বাড়াতে পুরস্কার হিসেবে ওমরাহ-হজের অফার, কী বলে ইসলাম

পণ্যের বিক্রি বাড়াতে পুরস্কার হিসেবে ওমরাহ-হজের অফার, কী বলে ইসলাম
সৌদি আরবের মক্কায় অবস্থিত কাবাঘর তাওয়াফ করছেন হাজিরা। ছবি: সংগৃহীত

বিগত কয়েক বছর ধরে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পণ্যের বিক্রি বাড়াতে নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত মূল্যে পণ্য কেনার বিনিময়ে বিনামূল্যে হজ বা ওমরাহ করানোর অফার দিচ্ছে। সময় শেষে ক্রেতাদের মধ্যে লটারি দিয়ে কয়েকজনকে হজ বা ওমরাহ পাঠানোর কথা বলা হয় সেখানে। কেউ কেউ হজ বা ওমরাহ পালনের সুযোগ লাভের আশায় অফারে পণ্যটি কিনছেন। 

Advertisement

অফারটি মূলত কোম্পানির পণ্যের বিক্রি বাড়ানোর মার্কেটিং কৌশল। প্রশ্ন হলা, হজ বা ওমরাহর সুযোগ লাভের অফার দিয়ে পণ্য বিক্রি করা জায়েজ কি না? এ রকম লটারিতে বিজয়ী হয়ে হজ বা ওমরাহ করলে সওয়াব পাওয়া যাবে কি না?

ইসলামি গবেষকদের মতে, পণ্যের বিক্রি বাড়ানোর কৌশল হিসেবে হজ বা ওমরাহর মতো ইবাদতকে পুরস্কার হিসেবে ঘোষণা করা, এতে অংশ নেওয়া এবং বিজয়ী হলে হজ বা ওমরাহ করার বিষয়টি তিনটি শর্তে জায়েজ বা বৈধ।

১. অফারের কারণে পণ্যের দাম স্বাভাবিক মূল্য থেকে বাড়ানো যাবে না। বাজারে প্রচলিত এই জাতীয় পণ্যের বাজারমূল্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ রাখতে হবে। যদি বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করে, তাহলে ধরে নিতে হবে—গ্রাহক পুরস্কারের আশায় অধিক মূল্যে পণ্য কিনছেন। যেহেতু হজ বা ওমরাহর প্যাকেজ পাওয়া নিশ্চিত নয়, তাই পুরস্কারের আশায় বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য কেনা জুয়ার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, তাই জায়েজ হবে না। কোরআনে আছে, ‘হে মুমিনরা, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদি ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ নাপাক, শয়তানের কাজ। তাই তোমরা তা পরিহার করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৯০) 

২. পণ্যের গুণগতমান কমানো যাবে না। ত্রুটিযুক্ত পণ্য বিক্রি করা যাবে না। অফারের লোভ দেখিয়ে ত্রুটিযুক্ত পণ্য বিক্রি করা ধোঁকা। ইসলামে ধোঁকা দিয়ে পণ্য বিক্রি করা হারাম। হাদিসে আছে, ‘হজরত মুহাম্মদ (সা.) একদিন বাজারে একজন খাদ্য বিক্রেতার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি খাদ্যের ভেতর হাত প্রবেশ করে দেখলেন, ভেতরের খাদ্যগুলো ভেজা বা নিম্নমানের। এ অবস্থা দেখে তিনি বললেন, ‘হে খাবার পণ্যের মালিক, এটা কী?’ লোকটি বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল, এতে বৃষ্টি পড়েছিল।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তুমি সেটাকে খাবারের ওপরে রাখলে না কেন, যাতে মানুষ দেখতে পেত। যে ধোঁকা দেয়, সে আমার উম্মত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০২) 

৩. গ্রাহকের মূল উদ্দেশ্য হতে হবে পণ্য কিনে উপকৃত হওয়া। শুধু পুরস্কার পেতে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও পণ্য কেনা যাবে না। কোম্পানি বিনামূল্যে তা দিলে ভালো, নতুবা কোনো বিষয় নয়। প্রয়োজন না থাকার পরও শুধু অনিশ্চিত এই পুরস্কারের আশায় পণ্য কেনা জুয়ার মতোই।

এ তিনটি শর্ত যথাযথভাবে পাওয়া গেলে কোম্পানির পক্ষ থেকে লটারি কুপনের মাধ্যমে পুরস্কার প্রদান হাদিয়া হিসেবে বিবেচিত হবে। জায়েজ পদ্ধতিতে করা লটারিতে জয়ী হলে গ্রাহকের জন্য তা গ্রহণ করা বৈধ। হজ বা ওমরাহর সুযোগ পেলে হজ-ওমরাহ করাও জায়েজ হবে। চাইলে অন্য কাজেও ব্যবহার করতে পারবে। ফাতাওয়া শামিতে আছে, ‘লটারির মাধ্যমে হাদিয়া বা পুরস্কার বিতরণ ও গ্রহণ করা বৈধ।’ (ফাতাওয়া শামি, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩৬২) 

তিনটি শর্তের কোনো একটির লঙ্ঘন হলে পুরো কার্যক্রমটি শরিয়ত পরিপন্থি হবে। এ অবস্থায় কোম্পানির জন্য লটারির আয়োজন করা, এতে অংশ নেওয়া, বিজয়ী হলে পুরস্কার গ্রহণ করাও নাজায়েজ হবে। 

ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফিকহ একাডেমির (ওআইসি) বাংলাদেশের সদস্য মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘পণ্যের বিক্রি বাড়ানোর মার্কেটিং কৌশল হিসেবে হজ বা ওমরাহর মতো ইবাদতকে পুরস্কার হিসেবে ঘোষণা করা ইসলামি শরিয়তে নিষেধ নেই। হজ বা ওমরাহর অফার দিয়ে পণ্য বিক্রি করা সম্পূর্ণ বৈধ। তবে অফারের কারণে পণ্যের দাম স্বাভাবিকের তুলনায় বাড়ানো যাবে না। পণ্যের গুণগত মান কমানো যাবে না। ক্রেতাকে ধোঁকা দেওয়া যাবে না।’

তার মতে, জুয়া সংশ্লিষ্ট লটারি অবৈধ হলেও যা দিয়ে শুধু ব্যক্তি বা বস্তু নির্ধারণ করা হয়, এমন লটারি বৈধ। স্বেচ্ছায় প্রদত্ত একপক্ষীয় হিবা বা গিফট বিতরণে লটারি সর্বসম্মতিক্রমে জায়েজ।

 

পণ্যের গুণগতমান সঠিক, বাজারমূল্যে পণ্য বিক্রি ও লটারি ব্যবস্থাকে প্রতারণার হাতিয়ার না বানানো হলে এবং ক্রেতা হজ বা ওমরাহর পুরস্কার পেলে তার হাতে তা তুলে দিতে হবে, বলছেন মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ।

তবে কোনো কোনো ইসলামি স্কলার বলছেন, ইবাদতকে মার্কেটিং কৌশল হিসেবে ব্যবহার না করা ভালো। পূর্ববর্তী বিজ্ঞ আলেম বা ফকিহদের যুগে কোনো ইবাদত বা হজ-ওমরাহর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বতন্ত্র ইবাদতকে মার্কেটিং বা পণ্য বিক্রির কৌশল হিসেবে ব্যবহারের দৃষ্টান্ত নেই।