‘নেই কাজ তো খই ভাজ’ প্রবাদটির পেছনের আসল গল্প

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
‘নেই কাজ তো খই ভাজ’ প্রবাদটির পেছনের আসল গল্প
খই। ছবি : সংগৃহীত

বাংলা ভাষার অনেক প্রবাদই আমাদের মুখে মুখে প্রচলিত। কিন্তু সেগুলোর পেছনের ইতিহাস বা প্রকৃত অর্থ অনেকেরই জানা নেই। তেমনই একটি পরিচিত প্রবাদ হলো নেই কাজ তো খই ভাজ। আমরা সাধারণত এটি অলস মানুষকে উদ্দেশ করে বলি। কিন্তু মজার বিষয় হলো, খই ভাজা মোটেও সহজ কাজ ছিল না।

বরং একসময় এটি ছিল সময়সাপেক্ষ, ধৈর্যের এবং দক্ষতার কাজ। তাই এই প্রবাদের অর্থও অনেক গভীর।

খই ভাজা কেন কঠিন কাজ ছিল?

বর্তমানে বাজার থেকে সহজেই প্যাকেটজাত খই কিনে আনা যায়। কিন্তু আগে খই তৈরি করা ছিল বেশ পরিশ্রমের কাজ।

প্রথমে ধান নির্দিষ্ট সময় পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হতো। এরপর ভালোভাবে শুকিয়ে বালি গরম করে তাতে ধান ভাজতে হতো। পুরো কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল আগুনের তাপ ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।

তাপ কম হলে ধান ফুটত না, আবার বেশি হলে পুড়ে যেত। তাই খই ভাজতে অভিজ্ঞতা, ধৈর্য এবং মনোযোগের প্রয়োজন ছিল।

তাহলে এই প্রবাদের অর্থ কী?

অনেকে মনে করেন, এই প্রবাদের মাধ্যমে অলস মানুষকে ব্যস্ত রাখার কথাই বলা হয়েছে।

আগের গ্রামীণ সমাজে কেউ যদি কোনো কাজ না করে বসে থাকতেন, তাহলে তাকে খই ভাজার মতো শ্রমসাধ্য কাজে লাগিয়ে দেওয়া হতো। এতে একদিকে সময় কাজে লাগত, অন্যদিকে অলসতাও কমত।

অর্থাৎ, নেই কাজ তো খই ভাজ কথাটি আসলে সহজ কোনো কাজের কথা বলে না। বরং এমন একটি কাজের কথা বলে, যেখানে সময়, শ্রম এবং ধৈর্য লাগে।

এই প্রবাদের ইতিহাস

এই প্রবাদের সুনির্দিষ্ট উৎস বা কে প্রথম এটি ব্যবহার করেছিলেন, তার কোনো লিখিত প্রমাণ নেই।

তবে ভাষাবিদদের ধারণা, কৃষিনির্ভর বাংলার গ্রামীণ সমাজ থেকেই এর প্রচলন শুরু হয়। সেই সময় প্রায় প্রতিটি পরিবারেই ধান থেকে খই তৈরি করা হতো। ফলে মানুষ এই কাজের কষ্ট সম্পর্কে ভালোভাবেই জানত। সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই প্রবাদটির জন্ম হয়েছে বলে মনে করা হয়।

এখন কীভাবে ব্যবহার করা হয়?

বর্তমানে এই প্রবাদ শুধু ঘরোয়া কথাবার্তাতেই নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়। কোনো ব্যক্তি যখন প্রয়োজনীয় কাজ বাদ দিয়ে অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট করেন, তখন অনেকেই মজা করে বলেন, নেই কাজ তো খই ভাজ।

অর্থাৎ, এখানে খই ভাজা বলতে এমন কোনো কাজে সময় ব্যয় করাকে বোঝানো হয়, যার বিশেষ প্রয়োজন নেই।

খই ভাজার ঐতিহ্য এখনও আছে

যদিও এখন বেশিরভাগ মানুষ বাজারের খই কিনে খান, তবুও গ্রামের কিছু এলাকায় এখনও উৎসব বা বিশেষ অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে খই ভাজা হয়। বিশেষ করে নবান্ন, পৌষ উৎসব বা বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনে খই এবং খইয়ের নাড়ু এখনও গুরুত্বপূর্ণ খাবার হিসেবে স্থান ধরে রেখেছে।

‘নেই কাজ তো খই ভাজ’ প্রবাদটি শুধু অলস মানুষকে খোঁচা দেওয়ার জন্য তৈরি হয়নি। এর ভেতরে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য এবং সময়ের মূল্য বোঝানোর একটি বার্তা। তাই পরেরবার এই প্রবাদটি শুনলে শুধু মজার কথা হিসেবে না দেখে এর পেছনের বাস্তব ইতিহাস ও অর্থটিও মনে রাখুন।

সূত্র: টিভি ৯