‘আ.লীগের মৃত চার নেতা কবর থেকে উঠে ককটেল ও হাতবোমা ছুড়েছেন’

এশিয়া পোস্ট নিউজ, বরিশাল
‘আ.লীগের মৃত চার নেতা কবর থেকে উঠে ককটেল ও হাতবোমা ছুড়েছেন’
মামলায় আসামি করা মৃত চারজন। বাঁ থেকে বরিশাল সিটির সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী, হাফিজুর রশিদ, রেজাউর রহমান ও আবুল ফারুক।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দুই শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বরিশালে একটি মামলা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে চারজন মৃত নেতার নাম রয়েছে।

এজাহার অনুযায়ী, তারা কবর থেকে উঠে মহাসড়কের ওপর টায়ারে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। আগুন নেভাতে গেলে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা ও হত্যার ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছেন। তারা ককটেল ও হাতবোমা নিক্ষেপ করেছেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন আরও ২০০ জনের বেশি নেতা।

মামলার বাদী এজাহারে এমন অভিযোগ উল্লেখ করেছেন। বৃহম্পতিবার (২ জুলাই) বরিশাল অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগ দিয়ে মামলার আবেদন করা হয়।

আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজিব মজুমদার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, একটি নালিশী মামলা হয়েছে। উপপুলিশ কমিশনাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন বিচারক।

এজাহার সূত্রে জানা যায়, মামলাটি করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতা ও জাতীয় ছাত্রশক্তির বরিশাল মহানগর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মারজুক আব্দুল্লাহ।

মামলায় আসামি করা হয়েছে ২৪৮ জনকে। এর মধ্যে ২১২ নম্বর আসামি খন্দকার রেজাউর মারা গেছেন ২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি। বাদীর অভিযোগ, রেজাউর গত ১০ জুন নগরীর গড়িয়ারপার এলাকায় আওয়ামী লীগের ব্যানানে মিছিল করেছেন এবং সড়কে হাতবোমা ছুড়েছেন।

১৯৮ নম্বর আসামি আবুল ফারুকের মৃত্যু হয়েছে ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ। তার বিরুদ্ধেও ১০ জুন মিছিলের অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২১ সালের ১৯ অক্টোবর মারা যান ২২৫ নম্বর আসামি হাফিজুর রশিদ এবং একই বছরের ২৬ জুলাই মারা যান ১৯৫ নম্বর আসামি আলী হাওলাদার। তাদের বিরুদ্ধেও আনা হয়েছে ওই মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ
কবর থেকে উঠে মহাসড়কের ওপর টায়ারে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। আগুন নেভাতে গেলে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা ও হত্যার ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছেন। তারা ককটেল ও হাতবোমা নিক্ষেপ করেছেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন আরও ২০০ জনের বেশি নেতা

এজাহার দেখুন এখানে

উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে আরও রয়েছেন, বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ, বরিশাল জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএম জাহাঙ্গীর, সাবেক মেয়র প্রয়াত শওকত হোসেন হিরনের স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ এবং বরিশাল সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু।

আসামির তালিকায় চারজন প্রয়াত নেতার নাম যুক্ত করার বিষয়ে ফেসবুকে ভিডিও বার্তা দিয়েছেন বরিশাল সিটির ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের বরিশাল জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক রাজীব হোসেন খান।

রাজীব হোসেন খান ভিডিওতে বলেন, মারজুক নামের যে ব্যক্তি মামলাটি করেছেন তিনি আগেও একটি মামলা করেছিলেন। এই মামলা যে ভুয়া সেটার বড় প্রমাণ আসামি চারজন মৃত। তারা কি কবর থেকে উঠে এসে বাদীর ওপর ককটেল নিক্ষেপ করেছেন। যারা মারা গেছেন প্রত্যেকের জানাজায় ছিলাম আমি।

মামলায় বাদী উল্লেখ করেছেন, বিবাদী কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের সক্রিয় সদস্য। বিবাদীরা জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র ও অর্থের যোগানদাতা। বর্তমানে বিভিন্নস্থানে ঝটিকা মিছিলে অংশ নিয়ে বিস্ফোরণ ঘটানো ও ভাংচুরের প্রতিরোধকারী জুলাইযোদ্ধাসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের হামলা এবং হত্যাচেষ্টাকারী ও মানুষের জানমালের ক্ষতিসাধনকারী।

আরও উল্লেখ করা হয়, গত ১০ জুন বিকেলে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী রামদা, চাপাতি, লোহার রড, হকিষ্টিক, পাইপগান, মর্টারগান, বন্দুক, ককটেল ও হাতবোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করেন তারা। পরে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্লোগান দেন। খবর পেয়ে প্রতিরোধ করলে ককটেল ও হাতবোমা নিক্ষেপ করেন। মহাসড়কের ওপর টায়ারে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। আগুন নেভাতে গেলে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা ও হত্যার ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছে। ১৬ জুন নগরীর ভাঙ্গার পোল ও ২২ জুন কাশিপুর মৃত্তিকা অফিসের সামনে একই ধরনের কর্মকাণ্ড করেছেন।

মামলার বাদী মারজুক আব্দুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, রেজা নামে যে ব্যক্তির নাম দেওয়া হয়েছে মামলার আসামি হিসেবে, সেটা সাক্ষীদের ভুলের কারণে এসেছে। বাকি তিনজনের বিষয় আমি কিছু জানি না। সাক্ষীদের ভুল ইনফরমেশনের কারণে এমনটা হয়েছে।

আসামির তালিকায় মৃত ব্যক্তির নাম থাকায় নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। সমাজ ও আইন বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে বলছেন, এ ধরনের ঘটনা আদালত অবমাননা ও পুলিশকে বিভ্রান্ত করার সামিল। মিথ্যা মামলা করার বিষয় প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশালের নগর সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, এটা আদালত অবমাননা ও পুলিশকে বিভ্রান্ত করার সামিল। যেহেতু পুলিশ তদন্তভার পেয়েছে পুরো বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখবে আশা করি। নির্দোষ মানুষ যেন ভোগান্তির শিকার না হয় সেটাও অনুসন্ধান করা উচিত।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাভে অংশ নেওয়া বরিশালের আইনজীবী আবু আল রায়হান (রুদ্রাক্ষ রায়হান) বলেন, মৃত মানুষকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করলে তা শুরুতে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। কোনো ব্যক্তি যদি আদালতে মিথ্যা মামলা করেন অথবা কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দেন, সেক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ২০৯ ও ২১১ ধারায় তার বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আশিক সাঈদ বলেন, তদন্ত আদালত থেকে আমাদের কাছে এসেছে। মামলায় যেসব ঘটনা ও সময় উল্লেখ করা হয়েছে সে সময়ে এমন ঘটনা ঘটেছে কি না পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। চারজন আসামি যদি মৃত হয়, তদন্তে যদি প্রমাণ পাওয়া যায়, যেটা সত্য সেই রিপোর্ট চলে যাবে।

বিষয় :বরিশাল