বিশ্ব আনারস দিবস আজ

বাইরে কাঁটায় ঢাকা শক্ত খোসা, মাথায় সবুজ পাতার মুকুট। প্রথম দেখায় খুব একটা আকর্ষণীয় না লাগলেও ভেতরে লুকিয়ে থাকে রসালো, সুগন্ধি আর মিষ্টি স্বাদের ফল। এই ফলই আনারস। বিশ্বের নানা দেশে প্রিয় এই ফলকে ঘিরেই প্রতি বছর ২৭ জুন পালিত হয় বিশ্ব আনারস দিবস।
এই দিনটি কোনো জাতিসংঘ ঘোষিত দিবস নয়। তবে আনারসের জনপ্রিয়তা, পুষ্টিগুণ এবং কৃষিতে এর গুরুত্ব তুলে ধরতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও ফলপ্রেমীরা দিনটি উদযাপন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এদিন আনারস নিয়ে নানা তথ্য, রেসিপি ও ছবি শেয়ার করা হয়।
দক্ষিণ আমেরিকা থেকে সারা বিশ্বে
আনারসের জন্ম দক্ষিণ আমেরিকায়। বিশেষ করে বর্তমান ব্রাজিল ও প্যারাগুয়ে অঞ্চলে বহু শতাব্দী আগে এর চাষ শুরু হয়। স্থানীয় আদিবাসীরা শুধু ফল হিসেবেই নয়, ওষুধ ও আতিথেয়তার প্রতীক হিসেবেও আনারস ব্যবহার করতেন।
১৪৯৩ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে প্রথম আনারসের সঙ্গে পরিচিত হন। এরপর ইউরোপে পৌঁছে যায় এই ফল। সে সময় আনারস এতটাই বিরল ছিল যে এটি ধন-সম্পদ ও অভিজাত জীবনের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পায়। ইউরোপের রাজপ্রাসাদে অতিথি আপ্যায়নে আনারস প্রদর্শন করা হতো। পরে ধীরে ধীরে এশিয়া, আফ্রিকা ও বিশ্বের উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে আনারসের চাষ ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে আনারস অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় একটি মৌসুমি ফল। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর চাষ হলেও মধুপুর, টাঙ্গাইল, মৌলভীবাজার, সিলেট, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান অঞ্চলের আনারস বেশি পরিচিত।
বিশেষ করে মধুপুরের আনারস স্বাদ ও গন্ধের জন্য আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। বর্ষাকালে বাজারে প্রচুর আনারস দেখা যায় এবং তখন তুলনামূলক কম দামেও কিনতে পাওয়া যায়।
পুষ্টির ভান্ডার
আনারস শুধু সুস্বাদু নয়, এটি নানা পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে ভিটামিন সি, ম্যাঙ্গানিজ, খাদ্যআঁশ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং বিভিন্ন খনিজ উপাদান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে আনারস খেলে যেসব উপকার পাওয়া যেতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে-
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে
- শরীরে ভিটামিন সি-এর ঘাটতি পূরণে সাহায্য করে
- হজমে সহায়ক ভূমিকা রাখে
- শরীরকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে
- কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে
আনারসে ব্রোমেলেইন নামে একটি প্রাকৃতিক এনজাইম রয়েছে। এটি প্রোটিন ভাঙতে সাহায্য করে এবং হজম প্রক্রিয়াকে সহজ করতে ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে অনেক দেশে মাংস নরম করতেও আনারসের রস ব্যবহার করা হয়।
কাঁচা না পাকা, কোনটি ভালো?
অনেকে কাঁচা আনারস খেতে পছন্দ করেন, আবার কেউ পুরোপুরি পাকা আনারসের মিষ্টি স্বাদ উপভোগ করেন। তবে খুব কাঁচা আনারস বেশি খেলে মুখে জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তি হতে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত পাকা আনারস দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।
ভালো আনারস বেছে নিতে খেয়াল রাখতে পারেন কয়েকটি বিষয়। ফলটি হাতে তুললে ভারী লাগবে, নিচের অংশে মিষ্টি সুগন্ধ থাকবে এবং খোসার রং সবুজ থেকে সোনালি-হলুদের দিকে যেতে শুরু করবে।
শুধু ফল নয়, রান্নাতেও জনপ্রিয়
আনারস দিয়ে শুধু ফলের প্লেটই নয়, তৈরি হয় নানা ধরনের খাবার। যেমন - আনারসের জুস, ফলের সালাদ, স্মুদি, জ্যাম, চাটনি, কেক ও ডেজার্ট এবং মুরগি, গরু বা চিংড়ির সঙ্গে আনারসের বিভিন্ন পদ।
কিছু মজার তথ্য
- আনারস আসলে একটি একক ফল নয়। এটি অনেক ছোট ছোট ফল একসঙ্গে মিলেই তৈরি হয়।
- একটি আনারস পরিপক্ব হতে সাধারণত ১৮ থেকে ২৪ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
- গাছে একবারে সাধারণত একটি বড় আনারসই জন্মায়।
- বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আনারস উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে কোস্টারিকা, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও চীন।
- ইংরেজিতে Pineapple নাম হলেও বিশ্বের অনেক ভাষায় এর নাম Ananas, যা দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসী ভাষা থেকে এসেছে।
গরমের দিনে এক টুকরো ঠান্ডা আনারস যেমন স্বস্তি দেয়, তেমনি এটি আমাদের খাদ্যতালিকায় যোগ করতে পারে প্রয়োজনীয় পুষ্টিও। তাই বিশ্ব আনারস দিবস শুধু একটি ফল উদযাপনের দিন নয়, বরং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কথাও মনে করিয়ে দেয়।





