Advertisement

সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা যে ১৫ অভ্যাস নিয়মিত মেনে চলেন

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা যে ১৫ অভ্যাস নিয়মিত মেনে চলেন
ছবি: সংগৃহীত

চারপাশে ধুলাবালি, জীবাণু ও ভাইরাসের উপস্থিতি এখন দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ। এর মধ্যে লক্ষ করলে দেখা যায়, সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা তুলনামূলকভাবে খুব কমই অসুস্থ হন। এর পেছনে কোনো অলৌকিক ওষুধ বা বিশেষ প্রতিরোধক্ষমতা নয়, বরং রয়েছে প্রতিদিনের কিছু সচেতন অভ্যাস।

টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞদের নিজেদের সুস্থতার জন্য মেনে চলা ১৫টি কার্যকর অভ্যাসের কথা।

১. রান্নাঘরে কাটিং বোর্ডের রং আলাদা রাখা

খাদ্যবাহিত রোগের প্রধান কারণ হলো 'ক্রস-কনটামিনেশন' বা এক খাবারের জীবাণু অন্য খাবারে ছড়িয়ে পড়া। বিশেষজ্ঞ জিল রবার্টসের মতে, কাঁচা মাংস ও শাকসবজির জন্য আলাদা কাটিং বোর্ড ব্যবহার করা উচিত। মাংসের জন্য নির্দিষ্ট লাল রঙের বোর্ড এবং সালাদ বা সবজির জন্য অন্য বোর্ড ব্যবহার করলে জীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।

২. সসপ্যান বা বোলে নয়, চলন্ত পানিতে শাকসবজি ধোয়া

অনেকে পাত্রে পানি জমিয়ে শাকসবজি ভিজিয়ে রাখেন। ডা. হাইডি তোরেসের মতে, এটি ভুল পদ্ধতি। কারণ পাত্রের পানিতে একটি পচা বা জীবাণুযুক্ত সবজি থাকলে তা বাকিগুলোকেও সংক্রমিত করে। পানির কল ছেড়ে দিয়ে চলন্ত পানির নিচে হাত দিয়ে ঘষে ঘষে ৩০ সেকেন্ড ধুলে ঘর্ষণের ফলে ব্যাকটেরিয়া ও কীটনাশক সহজেই ধুয়ে যায়।

৩. কিচেন স্পঞ্জ মাইক্রোওয়েভে জীবাণুমুক্ত করা

রান্নাঘরের ভেজা স্পঞ্জ হলো জীবাণুর প্রজননক্ষেত্র। অধ্যাপক কেলি স্টিউরীর পরামর্শ হলো প্রতিদিন ব্যবহারের পর স্পঞ্জটি ভালো করে ধুয়ে ভেজা অবস্থায় ২০ সেকেন্ডের জন্য মাইক্রোওয়েভে গরম করে নিন। এতে স্পঞ্জে থাকা বেশিরভাগ ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া মারা যায়।

৪. ইনফেকশন এড়াতে নিয়মিত ব্রাশ করা

দাঁতের মাড়ি বা ক্যাভিটির মাধ্যমে মুখের ব্যাকটেরিয়া সরাসরি রক্তপ্রবাহে মিশে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে ছড়াতে পারে। তাই শুধু শ্বাসের দুর্গন্ধ এড়াতেই নয়, বড় ধরনের ইনফেকশন থেকে বাঁচতে প্রতিদিন নিয়ম মেনে সঠিক পদ্ধতিতে ব্রাশ করা অত্যন্ত জরুরি।

৫. বাথরুমের ভেজা ম্যাট নিয়মিত ধোয়া

বাথরুমের বাইরে রাখা ভেজা ম্যাট ফাঙ্গাল ইনফেকশন বা অ্যাথলিটস ফুটের অন্যতম কারণ। ম্যাট নিয়মিত শুকানো ও সপ্তাহে অন্তত একবার ধোয়া উচিত। পাশাপাশি, টয়লেটের চারপাশে শোষক বা ফোমের তৈরি কার্পেট না রাখাই ভালো।

৬. ঘরের দরজাতেই জুতো খুলে রাখা

বাইরের রাস্তাঘাট কিংবা পাবলিক প্লেসের কোটি কোটি জীবাণু জুতোর সোলে লেগে ঘরে প্রবেশ করে। বিশেষজ্ঞ ড. সিজার ফিগুয়েরো ওরটিজের মতে, ঘরে জীবাণুর বিস্তার রুখতে ঘরের দরজাতেই বাইরের জুতো খুলে রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।

৭. অতিথি আসার আগে ঘরের জানালা খোলা

বাতাসে থাকা জীবাণু ঘরের মেঝের জীবাণুর চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা ঘরে অতিথি আসার আগে বা কোনো আড্ডার আগে জানাল খুলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করেন, যাতে ঘরের বাতাস ফ্রেশ থাকে।

৮. সময় নিয়ে সাবান পানিতে হাত ধোয়া

তাড়াহুড়ো করে হাত ধুলে জীবাণু পুরোপুরি মরে না। অন্তত ২০ সেকেন্ড সময় নিয়ে সাবান ও পানিতে ভালো করে হাত ধোয়া উচিত। পেট খারাপের ভাইরাস (যেমন: নোমোভাইরাস) এড়াতে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের চেয়ে সাবান-পানি অনেক বেশি কার্যকর।

৯. জনসমক্ষে কোনো জায়গা না ছোঁয়া

সব জায়গায় জীবাণু থাকে। বিশেষ করে লিফটের বোতাম, ক্লিনিকের দরজার হাতল কিংবা সোডা ফাউন্টেন স্পর্শ করার সময় কাপড়ের হাতা, শার্টের নিচ বা টিস্যু ব্যবহার করা নিরাপদ। আর হাত পরিষ্কার না করা পর্যন্ত মুখ, চোখ বা নাকে হাত দেওয়া যাবে না।

১০. সুপারমার্কেটের উন্মুক্ত 'ফ্রি স্যাম্পল' না খাওয়া

ট্রলি বা শপিং বাস্কেটে হাত দেওয়ার পর সেই হাত দিয়ে সুপারমার্কেটের কোনো উন্মুক্ত ফ্রি স্যাম্পল (খাবারের টুকরো) খাওয়া বড় ধরনের ভুল। ট্রলির হাতলে কাঁচা মাংস ও অন্যান্য জীবাণু লেগে থাকে, যা সরাসরি মুখে যেতে পারে।

১১. জিম বা লকাররুমে স্যান্ডেল ও তোয়ালে ব্যবহার

জিম বা লকাররুমের মেঝেতে ফাঙ্গাস এবং এমআরএসএ-এর মতো মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া থাকে। তাই জিমের শাওয়ার বা লকাররুমে সবসময় স্যান্ডেল পরা উচিত। যেকোনো বেঞ্চে বসার আগে তোয়ালে বিছিয়ে নেওয়া ভালো।

১২. কাটা স্থানে অ্যান্টিসেপ্টিকের আগে রানিং ওয়াটার

কোথাও কেটে গেলে সোজাসুজি অ্যান্টিসেপ্টিক না লাগিয়ে প্রথমে ট্যাপের চলন্ত পানিতে সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলা উচিত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রবাহমান পানি ক্ষতস্থানের মেকানিকাল ক্লিনিং বা জীবাণু দ্রুত ধুয়ে বের করে দিতে সাহায্য করে।

১৩. ভ্রমণের সময় চিমটা বা টুইজার সঙ্গে রাখা

পোকার কামড় থেকে লাইম ডিজিজের মতো মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি হতে পারে। ঘাস বা বনাঞ্চলে ঘুরতে গেলে সঙ্গে ছোট টুইজার রাখা উচিত, যাতে শরীরে কোনো পোকা কামড়ে ধরে থাকলে সঙ্গে সঙ্গে তুলে ফেলা যায়।

১৪. মশার কামড় এড়াতে নিয়মিত বাগ স্প্রে ব্যবহার

মশা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাণীদের একটি, যা ডেঙ্গু, ওয়েস্ট নাইল ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগ ছড়ায়। বাইরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে প্রতি ৬ ঘণ্টা পর পর রিপেলেন্ট বা মশা তাড়ানোর স্প্রে পুনরায় ব্যবহার করা দরকার।

১৫. বিদেশে ভ্রমণের সময় বোতলজাত পানি দিয়ে দাঁত ধোয়া

যেসব দেশে ট্যাপের পানির গুণমান ভালো নয়, সেখানে শুধু পানের জন্যই নয়, দাঁত ব্রাশ করা ও ব্রাশ ধোয়ার কাজেও বোতলজাত পানি ব্যবহার করা উচিত। ট্যাপের পানিতে থাকা অনুজীব ব্রাশের গায়ে জমে পেটের রোগ বা 'ট্রাভেলার্স ডায়রিয়া' তৈরি করতে পারে।

সুস্থ থাকার জন্য খুব জটিল কিছু করার প্রয়োজন নেই। দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস বদলে ফেলে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মৌলিক নিয়মগুলো মেনে চললেই অধিকাংশ সংক্রামক রোগ থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখা সম্ভব। তাই সুস্থ থাকতে চর্চা করতে পারেন এই অভ্যাসগুলো।