শিক্ষামন্ত্রীকে হেলিকপ্টার ছেড়ে ‘স্পাইডার ম্যান’ হতে শিক্ষার্থীদের স্মারকলিপি

পরীক্ষার হলে নকলের ‘অধিকার’ রক্ষা ও হেলিকপ্টারের পাখার বাতাসে চিরকুট উড়ে যাওয়া ঠেকাতে অভিনব এক প্রতিবাদ জানিয়েছে ‘পরীক্ষার্থী ঐক্য পরিষদ’। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী আনম এহসানুল হক মিলনকে দেওয়া এক হাস্যকৌতুকপূর্ণ স্মারকলিপিতে শিক্ষার্থীরা অনুরোধ করেছে, তিনি যেন হেলিকপ্টারে চড়ে অতর্কিত কেন্দ্র পরিদর্শন করে তাদের মানসিক চাপে না ফেলেন। স্মারকলিপিতে সরকারের অর্থ সাশ্রয় ও পরিবেশ দূষণের দোহাই দিয়ে বলা হয়েছে, মন্ত্রী যদি আসতেই চান তবে যেন হেলিকপ্টার ছেড়ে ‘স্পাইডারম্যানের’ মতো জানলা দিয়ে নীরবে প্রবেশ করেন। মূলত পরীক্ষার হলে নির্বিঘ্নে ‘টুকলি’ করার সুযোগ পেতেই এই বিদ্রূপাত্মক আবেদন নিয়ে হাজির হয়েছে শিক্ষার্থীরা। এশিয়া পোস্টের পাঠকের উদ্দেশ্যে সেই স্মারকলিপিটি হুবাহু তুলে ধরা হলো।
তারিখ: ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
বরাবর,
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী
শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়।
বিষয়: হেলিকপ্টারে চড়ে অতর্কিত পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন না করা প্রসঙ্গে একখানা ‘কান্নাকাটি’ মার্কা স্মারকলিপি।
মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়,
প্রথমে আমাদের ‘কপি-পেস্ট’ করা সালাম গ্রহণ করবেন। আপনি যখন পূর্বতন আমলে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, তখন আপনার হেলিকপ্টারের পাখার বাতাসে আমাদের বড় ভাই-বোনদের নকলের খাতা এমনভাবে উড়ে যেত যে, তারা পরীক্ষার হলে নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে সংকটে পড়ত। এখন আপনি পূর্ণ মন্ত্রী হয়ে ফিরে এসেছেন। আপনার এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তনে আমরা যতটা না আনন্দিত, তার চেয়ে বেশি ‘আতঙ্কিত’। আপনার আগের আমলের হেলিকপ্টারের গল্প শুনে এখন আমরা ফড়িং দেখেও ভয় পাচ্ছি।
আপনার এই আকাশপথের অভিযানে আমাদের শিক্ষা-জীবন এবং ‘নকল-অধিকার’ হুমকির মুখে পড়ছে। এমতাবস্থায়, কেন আপনার হেলিকপ্টারে চড়া উচিত নয়, সে সম্পর্কে আমাদের কিছু ‘যৌক্তিক’ (পড়ুন: আত্মঘাতী) দাবি নিচে পেশ করা হলো:
১. সরকারের বিপুল অর্থ সাশ্রয় (আমাদের তো আর তেল নাই!)
মাননীয় মন্ত্রী, দেশ এখন অর্থনৈতিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আপনি কি জানেন এক ঘণ্টা হেলিকপ্টার উড়াতে কত লিটার জ্বালানি লাগে? সেই জ্বালানি দিয়ে অন্তত দশটি জেনারেটর চালানো সম্ভব, যা দিয়ে আমাদের পরীক্ষার হলের ফ্যান ঘুরবে। আপনি হেলিকপ্টারে করে এসে আমাদের নকল ধরার যে ‘অমানবিক’ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, তাতে রাষ্ট্রের যে টাকা খরচ হচ্ছে, তা দিয়ে আমাদের জন্য ‘ডিজিটাল টুকলি’ বা ‘স্মার্ট ক্যালকুলেটর’ সরবরাহ করা যেত। আমরা চাই আপনি মিতব্যয়ী হোন। আপনি বাসে করে আসুন, জ্যামে আটকে থাকুন—ততক্ষণে আমরা অন্তত দুই-তিন সেট এমসিকিউ দাগিয়ে ফেলি। এতে আপনারও আরাম, আমাদেরও ইনকাম (মার্কস আর কি!)।
২. পরিবেশ ও শব্দের দূষণ (পাখার বাতাসে সব উড়ে যায়!)
আপনি যখন হেলিকপ্টার নিয়ে কেন্দ্রের ওপর দিয়ে নামেন, তখন যে বিকট শব্দ হয়, তাতে আমাদের মগজের ভেতর জমা রাখা ‘শর্টকাট ফর্মুলা’ গুলো ডিলিট হয়ে যায়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আপনার হেলিকপ্টারের পাখার বাতাস। গতবার এক বড় ভাই অভিযোগ করেছিলেন, তিনি যখন অতি কষ্টে বাম হাত দিয়ে আড়াল করে একটি চিরকুট দেখছিলেন, তখনই আপনার হেলিকপ্টারের বাতাসে সেই চিরকুট উড়ে গিয়ে সরাসরি হল সুপারের নাকে আছড়ে পড়ে। এই যে প্রাকৃতিক উপায়ে আমাদের ‘গোপন নথি’ ফাঁস হয়ে যাচ্ছে, এটা কি মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়? আমরা চাই পরীক্ষার হলে নিস্তব্ধতা, যেখানে শুধু আমাদের কলমের ঘষঘষানি আর পাশের বন্ধুর ফিসফিসানি শোনা যাবে।
৩. শিশুদের ওপর মানসিক চাপ (হেলিকপ্টার ভীতি)
ছোটবেলায় আমরা ছড়া পড়তাম, ‘আয় রে আয় টিয়ে, নায়ে ভরা দিয়ে’। এখন আমাদের পড়তে হচ্ছে, ‘আয় রে আয় মিলন, হেলিকপ্টারে বেলন’। আপনি কি বুঝতে পারছেন, পরীক্ষার হলের ওপর দিয়ে একটি বিশাল লোহার ফড়িং উড়ে যাওয়ার সময় আমাদের হৃদস্পন্দন কোথায় পৌঁছায়? আমাদের মনে হয়, এই বুঝি আপনি ঢুকে পড়লেন! এই মানসিক চাপে আমরা ভুলে যাই যে ‘ব’ তে ‘বল’ নাকি ‘ব’ তে ‘বই’। আমরা শৈশব থেকেই ভয়মুক্ত শিক্ষা চাই। আর ভয়মুক্ত শিক্ষা মানেই হলো—মন্ত্রী থাকবেন মন্ত্রণালয়ে, আর আমরা থাকব আমাদের ‘সহায়ক বই’ নিয়ে।
৪. ক্ষমতার ‘অপব্যবহার’ ও সেলফি বিড়ম্বনা
আপনি হেলিকপ্টার থেকে নামার পর সবাই আপনাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এমনকি হলের গার্ড দেওয়া স্যাররাও জানলা দিয়ে আপনার হেলিকপ্টার দেখতে থাকেন। এতে আমাদের মনোযোগ নষ্ট হয়। আমরা তখন বুঝতে পারি না যে সামনের জনের খাতা দেখব নাকি আপনার হেলিকপ্টারের মডেল দেখব। আপনি একজন জনবান্ধব নেতা। জনবান্ধব নেতা কখনো আকাশ দিয়ে ওড়ে না, তারা রাস্তা দিয়ে হাঁটে। আমরা চাই আপনি জ্যামে বসে থাকুন, আর সেই অবসরে আমরা আমাদের ‘শিক্ষা কার্যক্রম’ (নকল) চালিয়ে যাই।
৫. গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও আমাদের ভবিষ্যৎ
পৃথিবী উত্তপ্ত হচ্ছে। আপনার হেলিকপ্টার থেকে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড আমাদের পরীক্ষার হলের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। গরমে ঘামে আমাদের শরীরের কায়দাকরে রাখা নকলগুলো ভিজে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। আপনি কি চান না আমরা ভালো রেজাল্ট করি? এই কার্বন নিঃসরণ বন্ধের একমাত্র উপায় হলো আপনার হেলিকপ্টারটি গ্যারেজে তালা মেরে রাখা।
আমাদের কিছু ‘বিনীত’ প্রস্তাবনা:
১. রিমোট কন্ট্রোল পরিদর্শন: আপনি যদি সত্যিই আমাদের দেখতে চান, তবে দয়া করে জুম (Zoom) বা গুগল মিটে মিটিং করুন। আমরা আমাদের ক্যামেরা অন করে দেখাব যে আমরা কত ‘মনোযোগ’ দিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছি (ক্যামেরার নিচে কী আছে সেটা দেখার দরকার নেই)।
২. ছদ্মবেশ ধারণ: আপনি সাধারণ মানুষের মতো লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরে রিকশায় করে আসুন। এতে আমাদের পাহারাদাররা আপনাকে চিনতে পারবে না, আর আমরাও বীরদর্পে আমাদের ‘সৃজনশীলতা’ বজায় রাখতে পারব।
৩. নকলের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার: বর্তমান বাজারে কাগজের দাম অনেক। অনেক কষ্টে আমরা ছোট ছোট করে লিখে টুকলি বানাই। আপনার আগমনে যখন সেগুলো বাতিল হয়ে যায়, তখন আমাদের বিনিয়োগ নষ্ট হয়। আমরা চাই আপনি এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের (নকলিবাজ) রক্ষা করুন।
৪. স্পাইডারের মতো আসুন: আপনি যদি অন্য কোনো উপায় না পান তাহলে আমাদের পরীক্ষার হলে নীরব স্পাইডারম্যানের মতো দড়ি বেয়ে জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ুন। তাতে আমাদের কোনো সমস্যা হবে না।
উপসংহার:
মাননীয় মন্ত্রী, আপনি শিক্ষাবান্ধব মানুষ। কিন্তু দয়া করে ‘হেলিকপ্টারবান্ধব’ হবেন না। আমরা পড়াশোনা করতে চাই না, আমরা শুধু পাস করতে চাই। আর সেই পাসের পথে আপনার হেলিকপ্টার হলো এক বিশাল বাধা। আশা করি আপনি আমাদের এই করুণ আবেদন মঞ্জুর করবেন। অন্যথায় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আপনি হেলিকপ্টারে এলে আমরা সবাই মিলে নিচ থেকে আয়না ধরে আপনার চোখে প্রতিফলন ফেলব, যাতে আপনি আমাদের খাতা দেখতে না পান!
বিনীত,
‘পরীক্ষার্থী ঐক্য পরিষদ’
(যারা কলমের চেয়ে চিরকুটে বেশি বিশ্বাসী)
[সতর্কীকরণ: শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে লিখিত উপরোক্ত বিষয়টি স্যাটায়ার বা রম্য লেখা। পাঠকের বিনোদনের উদ্দেশে এশিয়া পোস্ট স্যাটায়ারটি লিখেছে। বিষয়টি বাস্তব ভেবে পাঠককে বিভ্রান্ত না হতে সতর্ক করা হলো।]




