গোল, দর্শক, তারকার ঝলকে রেকর্ডময় বিশ্বকাপ

৪৮ দল, ১০৪ ম্যাচ, তিন আয়োজক দেশ। তার সঙ্গে একসঙ্গে মেসি, রোনালদো, এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস ও হালান্ডদের উপস্থিতি। ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু থেকেই ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। গ্রুপ পর্ব শেষ হতেই সেই বড়ত্ব এখন সংখ্যাতেও স্পষ্ট।
গোল, দর্শক, টিভি ভিউয়ারশিপ, তারকাদের পারফরম্যান্স, স্কোয়াড ব্যবহার, সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার এই বিশ্বকাপ রেকর্ডের আসর হয়ে উঠছে। টুর্নামেন্ট এখনো শেষ হয়নি, কিন্তু গ্রুপ পর্বেই অনেক পরিসংখ্যান আগের আসরগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে।
সবচেয়ে বেশি আলো কেড়েছেন লিওনেল মেসি। ৩৯ বছরে দাঁড়িয়েও আর্জেন্টিনা অধিনায়ক গোলের পর গোল করে চলেছেন। চলতি বিশ্বকাপে তার গোল ৬টি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায়ও নতুন উচ্চতায় উঠেছেন তিনি। টানা ম্যাচে গোল, বয়সের রেকর্ড, হ্যাটট্রিক, সব মিলিয়ে মেসির শেষ দিকের বিশ্বকাপ অধ্যায়ও যেন নতুন করে কিংবদন্তি হয়ে উঠছে।
মেসির পেছনেই আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, ওসমান দেম্বেলে, আর্লিং হালান্ড ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়ররা। গোলদৌড়ে তাদের উপস্থিতি টুর্নামেন্টকে আরও তারকাখচিত করেছে। এমবাপ্পে বিশ্বকাপের সর্বকালের গোলতালিকায় মেসির খুব কাছাকাছি চলে এসেছেন। বয়স বিবেচনায় সামনে তার আরও বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ থাকায় ভবিষ্যতের রেকর্ড দৌড় আরও জমে উঠতে পারে।
ফ্রান্সের আক্রমণেও তারকার ঝলক কম নয়। এমবাপ্পের পাশে দেম্বেলে আলোচনায় এসেছেন বড় ম্যাচের পারফরম্যান্সে। অন্যদিকে প্রথম বিশ্বকাপেই গোলের সহজাত ক্ষমতা দেখাচ্ছেন হালান্ড। নরওয়ের বিশ্বকাপ যাত্রায় তার গোল ও উপস্থিতি দলকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
ব্রাজিলের বড় মুখ ভিনিসিয়ুসও ছন্দে। ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপের স্বপ্নে নেইমারের ফিটনেস যতটা আলোচনায়, ভিনিসিয়ুসের ফর্ম ততটাই বড় ভরসা। গতি, ড্রিবলিং, গোলের হুমকি, সব মিলিয়ে নকআউটে ব্রাজিলের আক্রমণ অনেকটাই তার ওপর নির্ভর করবে।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও নিজের আলাদা ইতিহাস লিখেছেন। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে গোল করে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম ফুটবলার হয়েছেন পর্তুগিজ তারকা। মেসি ও রোনালদো দুজনই এবার নিজেদের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলছেন, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে বিরল অর্জন।

শুধু তারকারা নয়, মাঠের ফুটবলও পরিসংখ্যানে উজ্জ্বল। গ্রুপ পর্বের ৭২ ম্যাচে গোল হয়েছে ২১৫টি, ম্যাচপ্রতি গড় প্রায় ৩টি। ৪৮ দলের মধ্যে ৪৭ দলই অন্তত একটি গোল করেছে। শুধু পানামা গোলের দেখা পায়নি। শটের সংখ্যাও বেশি। গ্রুপ পর্বে মোট ১ হাজার ৭৭৪টি শট হয়েছে, ম্যাচপ্রতি গড় ২৪.৬।
খেলার কার্যকর সময়ও বেড়েছে। গড়ে প্রতি ম্যাচে কার্যকর খেলা হয়েছে ৬৭ মিনিট, আগের আসরের ৬৩ মিনিটের তুলনায় যা উল্লেখযোগ্য উন্নতি। সময় নষ্ট কমানো ও ম্যাচের প্রবাহ ধরে রাখার চেষ্টার ফল মাঠে দেখা যাচ্ছে।
দর্শক উপস্থিতিতেও ২০২৬ বিশ্বকাপ রেকর্ড গড়ছে। গ্রুপ পর্বেই মাঠে এসেছে ৪৬ লাখের বেশি দর্শক। গড় উপস্থিতি ৬৪ হাজারের বেশি। স্টেডিয়ামের ৯৯ শতাংশের বেশি আসন ভরেছে। শুরুতে টিকিটের উচ্চমূল্য নিয়ে সমালোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার বড় স্টেডিয়ামগুলোতে ভরা গ্যালারিই দেখা যাচ্ছে।
ফ্যান ফেস্টেও ভিড় ছিল বিশাল। তিন আয়োজক দেশে ৫৫ লাখের বেশি মানুষ ফিফা ফ্যান ফেস্টে জড়ো হয়েছে। শুধু মাঠ নয়, শহরগুলোর বড় পর্দা, সঙ্গীত, খাবার ও উৎসবের পরিবেশও এই বিশ্বকাপকে আরও বড় অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে।

টিভি ভিউয়ারশিপেও আসরটি নতুন উচ্চতায়। উত্তর আমেরিকার তিন আয়োজক দেশের উদ্বোধনী ম্যাচগুলো বিপুল দর্শক টেনেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইংরেজি ভাষার সম্প্রচারে মেক্সিকো-দক্ষিণ আফ্রিকা উদ্বোধনী ম্যাচ রেকর্ড গড়েছে। ব্রাজিল-মরক্কো ম্যাচও যুক্তরাষ্ট্রে ইংরেজি ভাষার গ্রুপ পর্ব সম্প্রচারে নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে।
ব্রাজিলেও দর্শকসংখ্যা ছিল আকাশছোঁয়া। ব্রাজিল-মরক্কো ম্যাচে কোটি কোটি মানুষ টিভি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত ছিল। কানাডার প্রথম বিশ্বকাপ জয়ও দেশটির সম্প্রচার ইতিহাসে বড় দর্শক টেনেছে। চীনেও বিশ্বকাপের দর্শকসংখ্যা ২০ কোটি ছাড়িয়েছে।
এই বিশ্বকাপের আরেকটি বড় দিক স্কোয়াড ব্যবহারের বৈচিত্র্য। ৪৮ দলের ১ হাজার ২৪৮ খেলোয়াড়ের মধ্যে ৯৯৯ জন এরই মধ্যে মাঠে নেমেছেন। তাদের মধ্যে ৬৮৭ জন খেলেছেন বদলি হিসেবে। দলগুলো গড়ে প্রায় পাঁচজন করে বদলি ব্যবহার করছে, যা দেখাচ্ছে দীর্ঘ টুর্নামেন্টে স্কোয়াডের গভীরতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাসিং ফুটবলও চোখে পড়ার মতো। গ্রুপ পর্বে দলগুলো মিলিয়ে ৬৮ হাজারের বেশি পাস সম্পন্ন করেছে। স্পেন এই দিক থেকে সবার ওপরে। ক্রসের সংখ্যায় এগিয়ে কানাডা। আবার ফাউল, কার্ড ও লাল কার্ডের সংখ্যাও দেখাচ্ছে, ৪৮ দলের বড় আসরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা তীব্র।
সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ এখন পর্যন্ত গোল, দর্শক, তারকা ও নাটকের সমন্বিত উৎসব। টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় ম্যাচগুলো এখনো বাকি। নকআউটে চাপ বাড়বে, ভুলের সুযোগ কমবে, তারকারা আরও বড় মঞ্চ পাবে।
তাই এখনই সেরা বিশ্বকাপ বলে চূড়ান্ত রায় দেওয়া তাড়াহুড়ো। তবে এটুকু বলা যায়, সংখ্যার হিসাবে, দর্শকের আবেগে এবং মাঠের তারকাখচিত নাটকে ২০২৬ বিশ্বকাপ ইতিমধ্যেই ইতিহাসে নিজের জায়গা আলাদা করে নিচ্ছে।





