ব্রাজিলকে ভয় পাচ্ছে না জাপান, আত্মবিশ্বাসের কারণ কী

বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এ ব্রাজিলের সামনে জাপান। ইতিহাস, ঐতিহ্য, তারকা, বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা, সবকিছুতেই এগিয়ে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু জাপান এবার ব্রাজিলকে ভয় পাচ্ছে না। বরং সাম্প্রতিক ফর্ম, সংগঠিত ফুটবল আর আগের জয়ের স্মৃতি তাদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
হিউস্টনে সোমবার (২৯ জুন) ব্রাজিল সময় দুপুর ২টায় মুখোমুখি হবে দুই দল। বাংলাদেশ সময় ম্যাচটি শুরু হবে রাত ১১টায়। এই ম্যাচের জয়ী দল উঠবে শেষ ষোলোয়। নকআউট পর্ব হওয়ায় ভুলের সুযোগ নেই কারও।
ব্রাজিল-জাপান লড়াই বিশ্বকাপে নতুন নয়। ২০০৬ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল। সেই ম্যাচে ৪-১ গোলে জিতেছিল ব্রাজিল। সামগ্রিক মুখোমুখি লড়াইয়েও দীর্ঘদিন ব্রাজিলের প্রাধান্য ছিল। কিন্তু সেই ইতিহাসের মাঝেই গত বছর নতুন অধ্যায় যোগ করেছে জাপান।
গত অক্টোবরে টোকিওতে প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলকে ৩-২ গোলে হারায় জাপান। ব্রাজিল ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে তিন গোল করে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয় জাপান। সেটিই ছিল ব্রাজিলের বিপক্ষে ১৪ দেখায় জাপানের প্রথম জয়। প্রীতি ম্যাচ হলেও সেই জয় জাপানকে দেখিয়েছে, ব্রাজিলকে হারানো অসম্ভব নয়।
জাপানের কোচ হাজিমে মোরিয়াসুও সেই ম্যাচের আত্মবিশ্বাস সঙ্গে নিয়ে এগোচ্ছেন। তার ভাষায়, আগের ম্যাচে জাপান ব্রাজিলকে দেখিয়েছে যে তারা সহজ প্রতিপক্ষ নয়। ব্রাজিলকে তিনি বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ দলগুলোর একটি হিসেবে সম্মান করছেন, তবে একই সঙ্গে বিশ্বাস করেন, জাপানেরও জয়ের সুযোগ আছে।
এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে শুধু একটি জয় নয়, মোরিয়াসুর দীর্ঘ কাজও আছে। ২০১৮ বিশ্বকাপের পর দায়িত্ব নেওয়ার সময় জাপান নতুন পথ খুঁজছিল। ধীরে ধীরে দলটিকে আরও সংগঠিত, দ্রুতগতির ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছেন তিনি। ২০২২ বিশ্বকাপে জার্মানি ও স্পেনকে হারিয়ে জাপান বিশ্বফুটবলকে চমকে দিয়েছিল। শেষ ষোলোয় ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিলেও মোরিয়াসুর কাজের স্বীকৃতি মেলে। বিশ্বকাপের পরও তার সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করে জাপান।
বড় দলের বিপক্ষে জাপানের সাম্প্রতিক সাফল্যও আলোচনায় আছে। জার্মানি, স্পেন, ইংল্যান্ড ও ব্রাজিলের বিপক্ষে জয় তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। এই ফলগুলো জাপানকে শুধু আন্ডারডগ ভাবনার বাইরে নিয়ে গেছে। এখন তারা বড় ম্যাচে টিকে থাকার নয়, জেতার কথাও বলে।
২০২৬ বিশ্বকাপেও জাপান কঠিন পথ পেরিয়ে এসেছে। গ্রুপ ‘এফ’-এ নেদারল্যান্ডসের পেছনে দ্বিতীয় হয়ে শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে তারা। সুইডেনের সঙ্গে ১-১ ড্র করে নকআউটের জায়গা পায় মোরিয়াসুর দল। এর আগে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষেও তারা লড়াকু ফুটবল খেলেছিল। ইউরোপীয় শক্তির বিপক্ষে এই ফলগুলো জাপানের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে।
তবে জাপানের সামনে সমস্যা নেই, তা নয়। তাকেফুসা কুবো চোটের কারণে ব্রাজিল ম্যাচে খেলতে পারবেন না। উত্তর আমেরিকার দীর্ঘ ভ্রমণ, বিশ্রামের সময় কম পাওয়া এবং নকআউটের চাপ, সবই জাপানের জন্য চ্যালেঞ্জ। ২০২২ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে হারের স্মৃতিও এখনও আছে। তাই এবার পেনাল্টি শুটআউট হলে শট নেওয়ার ক্রম নিজেই ঠিক করবেন বলে জানিয়েছেন মোরিয়াসু।
জাপানের শক্তি তাদের সংগঠন, গতি এবং চাপের মধ্যে ঠান্ডা মাথায় খেলার ক্ষমতা। তারা বল পায়ে রেখে আক্রমণ গড়তে পারে, আবার দ্রুত ট্রানজিশনেও বিপজ্জনক। বড় দলের বিপক্ষে জাপানের আত্মবিশ্বাস এখন আর কল্পনার ওপর দাঁড়িয়ে নেই, দাঁড়িয়ে আছে সাম্প্রতিক ফলের ওপর।
তবে আত্মবিশ্বাস থাকলেও জাপান জানে, ব্রাজিলকে হারানো সহজ নয়। ব্রাজিলের আক্রমণে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ফর্মে আছেন। নেইমার ধীরে ধীরে ফিটনেস ফিরে পাচ্ছেন। কাসেমিরো, মারকিনিয়োস, দানিলোদের অভিজ্ঞতা আছে। কোচ কার্লো আনচেলত্তিও জাপানকে ফাইনালের মতো গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আনচেলত্তির জন্য এই ম্যাচে প্রতিশোধের আবহও আছে। গত অক্টোবরে জাপানের কাছে হার ছিল তার ব্রাজিল অধ্যায়ের শুরু দিকের বড় ধাক্কা। বিশ্বকাপে ব্রাজিল মরক্কোর সঙ্গে ড্র দিয়ে শুরু করলেও পরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-০ জয় এবং ভিনিসিয়ুসের ফর্ম ব্রাজিলকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।
এই ম্যাচ তাই শুধু ব্রাজিলের জন্য আরেকটি নকআউট পরীক্ষা নয়, জাপানের জন্যও নিজেদের নতুন পরিচয় প্রতিষ্ঠার সুযোগ। ইতিহাস বলছে ব্রাজিল এগিয়ে। সাম্প্রতিক বাস্তবতা বলছে, জাপানকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।
ব্রাজিল ষষ্ঠ বিশ্বকাপের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামবে। জাপান নামবে সেই স্বপ্নে ধাক্কা দেওয়ার আত্মবিশ্বাস নিয়ে।





