ফেবারিট থেকে অসহায়, ফ্রান্সের পতনের পাঁচ কারণ

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
ফেবারিট থেকে অসহায়, ফ্রান্সের পতনের পাঁচ কারণ
ফরাসিরা টানা তৃতীয় সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হারল। ছবি: গেটি ইমেজ

শেষ বাঁশির পর জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে মাঠে বসে ছিলেন দেজিরে দুয়ে। কিলিয়ান এমবাপ্পের চোখেমুখে তখন শূন্যতা, দিদিয়ের দেশমও নির্বাক। স্কোরবোর্ডে স্পেনের জয় ২-০। মাঠের খেলায় দুই দলের ব্যবধান ছিল তার চেয়েও বড়।

ফ্রান্সের এমন বিদায় অনুমান করা কঠিন ছিল। বিশ্বের সবচেয়ে বিধ্বংসী আক্রমণভাগগুলোর একটি, প্রতিযোগিতাজুড়ে অবাধে গোল করা দল এবং ১৪ বছরের অধ্যায় বিশ্বকাপ দিয়ে শেষ করতে চাওয়া একজন কোচ, সবকিছুই যেন তাদের শিরোপার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।

অথচ এখন শিরোপার পরিবর্তে ফ্রান্স এখন তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলতে যাবে মায়ামিতে। আর ফাইনালে ওঠার পথে তাদের এতটাই অচেনা করে দিয়েছে স্পেন যে পরাজয়ের কারণ খুঁজতে একটি বা দুটি মুহূতের দিকে তাকালে চলবে না।

চার আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ের ঝুঁকি

প্রতিযোগিতার আগের ম্যাচগুলোতে কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, ব্র্যাডলি বারকোলা ও মাইকেল ওলিসেকে একসঙ্গে খেলানোর সিদ্ধান্ত দেশমকে সাফল্য এনে দিয়েছিল। কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে একই পরিকল্পনা বিপদ ডেকে আনে।

এমবাপ্পে ও দেশম।
এমবাপ্পে ও দেশম।

বল নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের সেরা দলগুলোর একটির বিপক্ষে চারজন স্বভাবগত আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় নিয়ে নামায় মাঝমাঠে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য হারায় ফ্রান্স। প্রথম সারির চাপ সহজেই অতিক্রম করে মাঝমাঠে সংখ্যার সুবিধা তৈরি করে স্পেন।

ম্যাচের পর এমবাপ্পেও সমস্যাটি স্বীকার করেন। ফ্রান্স তিনজনকে দিয়ে স্পেনের দুই ডিফেন্ডারের ওপর চাপ দেওয়ার চেষ্টা করছিল। অথচ এমন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে প্রত্যেক খেলোয়াড়কে আলাদাভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন ছিল। পরিকল্পনার সেই ফাঁক কাজে লাগিয়ে একের পর এক প্রেস ভেঙে বেরিয়ে যায় স্পেন।

ওলিসেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া

ফ্রান্সের আক্রমণ পরিচালনার মূল দায়িত্ব ছিল ওলিসের ওপর। প্রতিযোগিতাজুড়ে তার পায়ের ছোঁয়ায় আক্রমণে গতি ও সৃষ্টিশীলতা পেয়েছিল দলটি। স্পেন খুব দ্রুত সেই পথ বন্ধ করে দেয়।

ওলিসে বল পেলেই তাকে ঘিরে ফেলা হয়েছে। তার সামনে এগোনোর জায়গা বন্ধ করার পাশাপাশি এমবাপ্পে ও দেম্বেলের দিকে পাস দেওয়ার পথও আটকে রেখেছে স্পেন। ম্যাচে কোনো প্রভাব ফেলতে না পারায় শেষ হওয়ার ১৮ মিনিট আগে তুলে নেওয়া হয় তাকে।

দেম্বেলে শুরুতে এমবাপ্পেকে একটি সুন্দর পাস দেওয়া ছাড়া প্রায় অদৃশ্য ছিলেন। বারকোলাও স্পেনের রক্ষণকে পরীক্ষায় ফেলতে পারেননি। ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের আক্রমণভাগই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে নিষ্প্রভ অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

৮২ মিনিটে প্রথম লক্ষ্যভেদ

ফ্রান্সের ব্যর্থতার সবচেয়ে পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায় পরিসংখ্যানে। পুরো ম্যাচে তাদের প্রত্যাশিত গোল ছিল মাত্র ০.৩। অপটা ১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বকাপের তথ্য সংরক্ষণ শুরুর পর এটিই ফ্রান্সের কোনো ম্যাচে সর্বনিম্ন।

আরও বিস্ময়কর তথ্য, ৮২ মিনিট পর্যন্ত স্পেনের গোল লক্ষ্য করে একটি শটও নিতে পারেনি ফ্রান্স। প্রথম লক্ষ্যভেদটি আসে বদলি দুয়ের কাছ থেকে, সেটিও ৩০ গজের বেশি দূর থেকে গোলরক্ষক উনাই সিমনকে উঁচু শটে পরাস্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা।

দুই গোলে পিছিয়ে থাকা একটি দলের কাছ থেকে যে তাড়না প্রত্যাশিত, সেটিও দেখা যায়নি। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও ঘুরে দাঁড়িয়েছিল ফ্রান্স। এবার তারা ম্যাচে ফেরার পরিবর্তে সময়ের সঙ্গে আরও মলিন হয়েছে।

শেষ দিকে স্পেন নিজেদের মধ্যে বল রেখে খেলেছে। গ্যালারি থেকে প্রতিটি পাসের সঙ্গে শোনা গেছে উল্লাস। ফ্রান্সের জন্য সেটি শুধু হার নয়, এক ধরনের অসহায় আত্মসমর্পণও ছিল।

প্রথম প্রতিকূলতায় দিশেহারা

মিকেল ওইয়ারসাবালের পেনাল্টিতে পিছিয়ে পড়ার পরই ফ্রান্সের পরিকল্পনা এলোমেলো হতে শুরু করে। প্রতিযোগিতায় এত দিন প্রায় সবকিছু তাদের পক্ষে গেছে। প্রথমবার কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে নতুন কোনো সমাধান বের করতে পারেনি দলটি।

পেদ্রো পোরোর গোল।
পেদ্রো পোরোর গোল।

রায়ান চেরকির কথায়ও সেই ইঙ্গিত ছিল। তার মতে, সবকিছু খুব সহজে চলতে থাকায় ফ্রান্স হয়তো নিজেদের অন্যদের চেয়ে অনেক ওপরে ভাবতে শুরু করেছিল।

ম্যাচের পর ফ্রান্সের ব্যর্থতা নিয়ে কোনো রাখঢাক করেননি চেরকি। প্রযুক্তিগত দক্ষতা, কৌশল এবং শারীরিক লড়াই, প্রতিটি জায়গাতেই স্পেনের কাছে হারের কথা স্বীকার করেন তিনি।

একের পর এক ব্যক্তিগত ব্যর্থতা

দলের সমস্যার সঙ্গে যোগ হয়েছিল কয়েকজন ফুটবলারের খারাপ দিন। আদ্রিয়েন রাবিও শুরু থেকেই বল হারাচ্ছিলেন এবং দ্রুত হলুদ কার্ড দেখেন। বিরতির আগে তার আরেকটি ফাউল দ্বিতীয় হলুদ কার্ড ডেকে আনতে পারত। ঝুঁকি না নিয়ে বিরতিতেই তাঁকে তুলে নেন দেশম।

উইলিয়াম সালিবা বিশ্বকাপের শুরু থেকেই ব্যথা নিয়ে খেলছিলেন। স্পেনের বিপক্ষে আধঘণ্টাও টিকতে পারেননি। মাঠে পড়ে গিয়ে নিজেই বদলির সংকেত দেন তিনি।

লুকাস দিনিয়ের জন্য লামিন ইয়ামালকে সামলানো ছিল কঠিন। তার ফাউল থেকেই পেনাল্টি পায় স্পেন। সিদ্ধান্তটি নিয়ে বিতর্কের সুযোগ থাকলেও ইয়ামালের বিপক্ষে দিনিয়েকে দীর্ঘ সময় একা রেখে দেওয়ার দেশমের পরিকল্পনাটিই বেশি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

একই প্রতিপক্ষ, একই শিক্ষা

স্পেনের বিপক্ষে এই ফলকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ২০২৪ ইউরোর সেমিফাইনালে ২-১ গোলে ফ্রান্সকে হারিয়েছিল স্পেন। পরের বছর নেশনস লিগের শেষ চারেও তাদের জয় ছিল ৫-৪ গোলে।

এবার বিশ্বকাপ মিলিয়ে টানা তিনটি সেমিফাইনালে একই প্রতিপক্ষের কাছে হারল ফ্রান্স। ধৈর্য ধরে বল রাখা, সঠিক সময়ে খেলার গতি বাড়ানো এবং প্রতিপক্ষকে অবস্থান থেকে বের করে আনার স্পেনের কৌশলের উত্তর এখনো খুঁজে পাননি দেশম।

তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ দিয়েই শেষ হবে ফ্রান্সের দায়িত্বে তার দীর্ঘ অধ্যায়। আগে থেকেই নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশ্বকাপের পর সরে যাবেন তিনি। পরবর্তী সময়ে জিনেদিন জিদানের হাতে দায়িত্ব যাওয়ার কথা।

ফ্রান্সের জন্য স্বস্তি, এই প্রতিভাবান দলের বেশির ভাগ ফুটবলারই আগামী বিশ্বকাপে থাকবেন। কিন্তু ভুল সংশোধনের জন্য চার বছর অনেক দীর্ঘ অপেক্ষা।

ফ্রান্স কোনো একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত কিংবা দুর্ভাগ্যজনক মুহূতের কারণে হারেনি। পরিকল্পনা থেকে প্রয়োগ, মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ এবং ব্যক্তিগত লড়াই, প্রতিটি জায়গাতেই তারা পিছিয়ে ছিল। স্পেন শুধু ফ্রান্সকে হারায়নি, শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার দলটির সব দুর্বলতাও এক রাতে প্রকাশ করে দিয়েছে।