Advertisement

লাতিন আমেরিকায় ফুটবল জার্সি যেভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
লাতিন আমেরিকায় ফুটবল জার্সি যেভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে
জার্সি এখন রাজনীতির নতুন অস্ত্র লাতিন আমেরিকায়। ছবি: এপি

লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে জাতীয় ফুটবল দলের ঐতিহ্যবাহী জার্সি কেবল মাঠের খেলা কিংবা ক্রীড়াপ্রেমের প্রতীক হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক লড়াই ও মতাদর্শের এক নতুন হাতিয়ারে।

বিশেষ করে ব্রাজিল ও কলম্বিয়ার মতো ফুটবল উন্মাদনার দেশগুলোতে কট্টর ডানপন্থী নেতারা নিজেদের তীব্র দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের প্রতীক হিসেবে জাতীয় ফুটবল জার্সিকে ব্যবহার করছেন। এতে সাধারণ সমর্থক ও বামপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

কলম্বিয়ার জার্সি বিতর্ক

সম্প্রতি কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন ডানপন্থী নতুন মুখ আবেল্যার্দো দে লা এস্প্রিয়েয়া। পেশায় আইনজীবী ও ফ্যাশন ব্যবসায়ী এস্প্রিয়েয়া সাধারণত দামি সুট-টাই পরতে অভ্যস্ত হলেও পুরো নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি কৌশলগতভাবে বেছে নেন কলম্বিয়ার ঐতিহ্যবাহী হলুদ জার্সি।

তাকে অনুসরণ করে তার কট্টর সমর্থকরাও তীব্র দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে এই পীতবর্ণের জার্সি পরা শুরু করেন।

কলম্বিয়ার ডানপন্থী নতুন মুখ আবেল্যার্দো দে লা এস্প্রিয়েয়া।
কলম্বিয়ার ডানপন্থী নতুন মুখ আবেল্যার্দো দে লা এস্প্রিয়েয়া।

তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জাতীয় প্রতীকের এমন চতুর ব্যবহারের তীব্র সমালোচনা করেছেন প্রভাবশালী বামপন্থী সিনেটর ইভান সেপেদা। তিনি এস্প্রিয়েয়ার বিরুদ্ধে কলম্বিয়ার জাতীয় ফুটবল জার্সি ‘চুরি’ করার সরাসরি অভিযোগ এনে বলেন, ‘এই জার্সি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়; বরং এটি সর্বস্তরের কলম্বিয়ানের।’

এমনকি বিতর্ক গড়ালে দেশটির একটি আদালত নির্বাচনী প্রচারণায় জাতীয় জার্সি ব্যবহারে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তবে আইনি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সমর্থকরা আদেশ অমান্য করে জার্সি পরেই দিনভর প্রচারণা চালিয়ে যান।

ব্রাজিলের জার্সি বিতর্ক

ব্রাজিলে জাতীয় জার্সির রাজনৈতিক ব্যবহারের ইতিহাস দীর্ঘদিনের হলেও, সাবেক কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জায়ের বলসোনারোর মেয়াদকালে তা চরম মাত্রায় পৌঁছায়। ২০১৮ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় বলসোনারো ও তার অনুসারীরা ব্রাজিলের ঐতিহাসিক ‘ক্যানারিনহো’ (সবুজ-হলুদ) জার্সিকে ডানপন্থী ও চরম রক্ষণশীল মূল্যবোধের ব্র্যান্ড হিসেবে তুলে ধরেন।

ব্রাজিলের ডানপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট বসলেরানো ব্রাজিল জার্সিতে (বাঁয়ে)।
ব্রাজিলের ডানপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট বসলেরানো ব্রাজিল জার্সিতে (বাঁয়ে)।

চলতি বছরের অক্টোবরে ব্রাজিলে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আইনি জটিলতা ও আদালতের রায়ে বলসোনারো নিজে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও তার বড় ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো ডানপন্থীদের ঝাণ্ডা ধরে মাঠে লড়বেন।

ব্রাজিলের আরেক ডানপন্থী নেতা ফ্লাভিও বলসোনারো
ব্রাজিলের আরেক ডানপন্থী নেতা ফ্লাভিও বলসোনারো

চলমান ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ চলাকালীন ফ্লাভিও প্রকাশ্যে ব্রাজিলের ঐতিহাসিক হলুদ জার্সিকে সরাসরি ‘বলসোনারোর নিজস্ব জার্সি’ বলে অভিহিত করে চরম বিতর্কের জন্ম দেন।

বামপন্থীদের পাল্টা প্রতিরোধ

ডানপন্থীদের এমন একচেটিয়া আধিপত্যের বিরুদ্ধে এখন পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলছে লাতিন আমেরিকার বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো। কলম্বিয়ার অন্যতম বামপন্থী জোট ‘হিস্টোরিক প্যাক্ট’-এর রাজনীতিবিদ ড্যানিয়েল মনরয় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা আমাদের জাতীয় পতাকার তিন রঙ আর প্রিয় ফুটবল জার্সিকে রাজনীতিতে এভাবে অপব্যবহার করতে দেব না।’

বামপন্থীরাও এখন জার্সি পড়ে র‌্যালিতে আসছে।
বামপন্থীরাও এখন জার্সি পড়ে র‌্যালিতে আসছে।

এই রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রতিবাদস্বরূপ বামপন্থী প্রার্থীরাও এখন থেকে জনসমক্ষে জাতীয় জার্সি পরেই উপস্থিত হতে শুরু করেছেন। অনেকে আবার সেই জার্সির বুকের ওপর নিজেদের প্রার্থীর ছবি, দলীয় চিহ্ন ও রাজনৈতিক স্লোগান প্রিন্ট করে নিচ্ছেন।

একই চিত্র দেখা গেছে ব্রাজিলেও। বলসোনারোর কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে হলুদ জার্সির অতি-সম্পৃক্ততার কারণে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সময় সাধারণ ব্রাজিলিয়ানদের মাঝে বিকল্প নীল রঙের জার্সির বিক্রি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল।

তবে বর্তমান নির্বাচনকে সামনে রেখে বামপন্থী সমর্থকরা আবারও জাতীয় হলুদ জার্সি গায়ে চাপাতে শুরু করেছেন। তাদের মতে, হলুদ জার্সির সঙ্গে বামপন্থীদের লাল রঙের প্রতীক যুক্ত করে কিংবা স্বাভাবিকভাবে পরিধান করেই তারা প্রমাণ করতে চান ব্রাজিল ও এর জাতীয় দল কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নয়, বরং তা প্রতিটি নাগরিকের।

ফুটবল জার্সির এমন অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক টানাপোড়েনে চরম ক্ষুব্ধ, বিভ্রান্ত ও ক্লান্ত বোধ করছেন সাধারণ ফুটবলপ্রেমীরা।

বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, লাতিন আমেরিকার সামাজিক সংস্কৃতিতে ফুটবল ও এর প্রতীকি চেতনার প্রভাব অত্যন্ত গভীর। ফলে সাধারণ মানুষের আবেগ, জনসমর্থন ও দেশপ্রেমকে কাজে লাগিয়ে সস্তা রাজনৈতিক বৈধতা পাওয়ার লক্ষ্যেই এই অঞ্চলের পপুলিস্ট নেতারা ফুটবল জার্সিকে নিজেদের প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে চলেছেন।

(সূত্র: আল জাজিরা)