বিষাক্ত আগাছানাশক ‘প্যারাকোয়াট’ নিষিদ্ধ করছে ভারত

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
বিষাক্ত আগাছানাশক ‘প্যারাকোয়াট’ নিষিদ্ধ করছে ভারত
হায়দ্রাবাদের উপকণ্ঠে একটি ধানক্ষেতে কীটনাশক ছড়াচ্ছেন এক কৃষক। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে নিষিদ্ধ অত্যন্ত বিষাক্ত আগাছানাশক ‘প্যারাকোয়াটের’ ওপর এবার দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞা জারির পথে হাঁটছে ভারত। দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও কঠোর পর্যালোচনার পর দেশটির কৃষি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি খসড়া বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত এই খসড়া প্রস্তাবটি চূড়ান্ত করার আগে আগামী ৩০ দিন জনসাধারণের মতামত ও আপত্তির জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের সিস্টার পোর্টাল ‘কিষাণ তাক’-এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মানুষ ও পশুর স্বাস্থ্যের মারাত্মক ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় সরকার দেশব্যাপী এই কীটনাশকটির উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন ও বিক্রির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব এনেছে।

ভারতের কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত ‘প্যারাকোয়াট ডাইক্লোরাইড নিষিদ্ধকরণ আদেশ, ২০২৬’-এর খসড়া বিজ্ঞপ্তিটি গত ১৩ জুলাই দেশটির সরকারি গেজেটে (গেজেট অব ইন্ডিয়া) প্রকাশিত হয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সর্বসাধারণের মতামত ও আপত্তির জন্য প্রস্তাবটি ৩০ দিন উন্মুক্ত থাকবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই বিষয়ে তাদের মতামত নয়াদিল্লির কৃষি ভবনে অবস্থিত কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (উদ্ভিদ সুরক্ষা) বরাবর পাঠাতে পারবেন।

কীটনাশকটি কী ও কেন নিষিদ্ধ হচ্ছে

বিশ্বের অন্যতম বিতর্কিত ও তীব্র বিষাক্ত আগাছানাশক ‘প্যারাকোয়াট ডাইক্লোরাইড’ মানবদেহ ও প্রাণীকুলের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হওয়ায় ইতোমধ্যে বিশ্বের ৭০টির বেশি দেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে ভারতে এখনো কৃষিক্ষেত্রে আগাছা দমনের জন্য এর ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে।

১৯৬৮ সালের কীটনাশক আইনের ২৭ ধারা প্রয়োগ করে এবার ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দেশটির কৃষিক্ষেত্রে এর ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাবিত আদেশটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হলে, প্যারাকোয়াট ডাইক্লোরাইড নিষিদ্ধকারী বৈশ্বিক দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হবে ভারত।

ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই আগাছানাশকটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির উদ্যোগ এবারই প্রথম নয়। এর আগে ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্য ব্যক্তিগতভাবে এর ব্যবহার সীমিত করেছিল, তবে আইনি ও প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে অন্যান্য রাজ্যে এমন পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি।

মঙ্গলবারের এই নতুন খসড়া বিজ্ঞপ্তিটি পূর্বের রাজ্যভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন নিয়মকে বাতিল করে দেশব্যাপী অভিন্ন নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করবে। বিজ্ঞপ্তিটি চূড়ান্ত অনুমোদনের পর এই কীটনাশকটির উৎপাদন বা বিতরণের লাইসেন্সধারীদের আগামী তিন মাসের মধ্যে তা সরকারের কাছে জমা দিতে হবে।

‘প্যারাকোয়াট’ কেন এত বিপজ্জনক

‘প্যারাকোয়াট’ কোনো সাধারণ আগাছানাশক নয়। চিকিৎসকদের মতে, এটি কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত রাসায়নিকগুলোর মধ্যে অন্যতম মারাত্মক ও ভয়াবহ। এর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, মানবদেহে এই বিষক্রিয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিষেধক বা অ্যান্টিডোট নেই এবং অত্যন্ত অল্প পরিমাণে শরীরে প্রবেশ করলেও তা প্রাণঘাতী হতে পারে।

শরীরে প্রবেশ করার পর প্যারাকোয়াট মূলত ফুসফুসকে আক্রমণ করে। এর ফলে ফুসফুসে অপরিবর্তনীয় ফাইব্রোসিস (টিস্যু শক্ত হয়ে যাওয়া) দেখা দেয় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।

ফুসফুস ছাড়াও এটি মানুষের কিডনি, লিভার, ত্বক এবং চোখের মারাত্মক ও স্থায়ী ক্ষতি করে। যেহেতু এই বিষক্রিয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট নিরাময়মূলক চিকিৎসা নেই এবং চিকিৎসকদের কেবল সহায়ক বা উপশমমূলক (সাপোর্টিভ কেয়ার) চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে হয়, তাই প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশি।

খামার বা কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহারের সময় এটি কৃষক ও কৃষি শ্রমিকদের স্বাস্থ্যকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে ফেলে। সাধারণত দুর্ঘটনাবশত গিলে ফেলা, স্প্রে করার সময় সূক্ষ্ম কণা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করা অথবা শরীরের কোনো ক্ষতস্থানের সংস্পর্শে এই বিষ এলে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও মারাত্মক বিষক্রিয়া ঘটে থাকে।

মানুষ ও পশুর স্বাস্থ্যের জন্য এমন চরম ঝুঁকির কারণেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড ও চীনসহ বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে প্যারাকোয়াটের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে বা পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।