আইন অমান্য করে ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধের ঘোষণা ট্রাম্পের

ইরানের সঙ্গে স্থগিত হয়ে যাওয়া যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা কংগ্রেসে আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে দেশটির আইন অনুযায়ী কেবল কংগ্রেসই যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে। গত ৭ জুলাই থেকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আবার শুরু হয়েছে বলে গত ১০ জুলাই লেখা এক চিঠিতে কংগ্রেসকে অবহিত করেছেন তিনি।
সোমবার (১৩ জুলাই) বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এ চিঠির বিষয় প্রকাশ্যে আনে। ট্রাম্পের প্রশাসন মনে করছে, এই নোটিশের মাধ্যমে কংগ্রেসের আগাম অনুমোদন ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে আগামী ৬০ দিন ধরে হামলার নতুন আইনি সুযোগ পেল।
চিঠিতে ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন নাগরিকদের জীবন রক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির স্বার্থে তিনি এই নতুন সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন।
চিঠিতে চলমান ইরান সংকটে মার্কিন প্রশাসনের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এতে জানানো হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের ওপর প্রথম হামলা শুরু করে। এরপর গত ৭ এপ্রিল দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতির নির্দেশ দেওয়া হয়। অবশ্য পরবর্তীতে এর মেয়াদ আরও বাড়ানো হয়।
চিঠিতে ট্রাম্প গত ১৭ জুন ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকের কথা উল্লেখ করে বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তার প্রশাসন সব ধরনের কূটনৈতিক চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু ইরান হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে সেই চুক্তির শর্ত সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করেছে। আর এই কারণে তিনি ইরানের ওপর নতুন করে বিমান হামলার নির্দেশ দিতে বাধ্য হয়েছেন।
সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন, পারস্য উপসাগরে ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর মার্কিন অবরোধ আবারও পুনর্বহাল করা হচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালিকে যেকোনো মূল্যে উন্মুক্ত রাখা হবে।
এদিকে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, কেবল দেশটির কংগ্রেসেরই যুদ্ধ ঘোষণার চূড়ান্ত ক্ষমতা রয়েছে, প্রেসিডেন্টের এককভাবে এই অধিকার নেই। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা দীর্ঘকাল ধরে দেশের নিরাপত্তা রক্ষার অজুহাতে আইনপ্রণেতাদের অনুমতি ছাড়া স্বল্পমেয়াদী সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করে আসছেন।
দেশটির ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট বা যুদ্ধ ক্ষমতা আইন অনুযায়ী, কোনো যুদ্ধ শুরু করার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই কংগ্রেসকে জানাতে হয় এবং কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া শুরু হওয়া এই ধরনের সামরিক অভিযান সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে এই ৬০ দিনের প্রথম সময়সীমাটি গত ১ মে শেষ হয়ে গিয়েছিল। তবে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, মাঝখানে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মাধ্যমে আগের যুদ্ধাবস্থাটি শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাই ওই সময়সীমা এখন আর কার্যকর নয়। যদিও বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন, যুদ্ধবিরতির কথা বলা হলেও ইরানের ওপর মার্কিন হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। ট্রাম্পের এই যুক্তিকে আইনের চরম ভুল ব্যাখ্যা হিসেবে দেখছেন ডেমোক্র্যাট এবং খোদ রিপাবলিকান দলের যুদ্ধবিরোধী আইনপ্রণেতারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিনিধি সভার (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) এক শীর্ষ ডেমোক্র্যাট কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যে যুদ্ধ চার থেকে ছয় সপ্তাহ চলবে বলা হয়েছিল, তা এখন মাসের পর মাস ধরে চলছে। প্রেসিডেন্ট চাইলেই নিজের মতো করে এই যুদ্ধকে আড়াল করতে পারেন না।
গত মাসেই মার্কিন সিনেট ও প্রতিনিধি সভা—উভয় কক্ষে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্পকে ইরান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়ে একটি বিশেষ প্রস্তাব পাস করা হয়। এই ভোটাভুটি প্রমাণ করে যে মাসব্যাপী চলা এই যুদ্ধ নিয়ে খোদ আমেরিকার ভেতরে উদ্বেগ কতটা চরমে পৌঁছেছে। তবে এই ভোটের পর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ট্রাম্প তার বিরোধীদের বিরুদ্ধে ইরানকে সুবিধা দেওয়ার এবং তার কাজকে কঠিন করে তোলার অভিযোগ এনেছেন।





