কোটালীপাড়ায় ১৫ দিনেই নতুন সড়কে ধস

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার শিকিরবাজার স্কাউট ভবন থেকে পূর্ব চিত্রাপাড়া পর্যন্ত সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ শেষ হওয়ার মাত্র ১৫ দিনের মাথায় বিভিন্ন স্থানে ধস ও ভাঙন দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতের বৃষ্টির পর সড়কের একাধিক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নির্মাণকাজের মান নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন উঠেছে।
শুক্রবার (১০ জুলাই) দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, নবনির্মিত সড়কের বিভিন্ন স্থানের কার্পেটিং উঠে গেছে এবং কোথাও কোথাও ইট সরে গিয়ে বড় ধরনের ধসের সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া রাস্তার দুই পাশের শোল্ডারে (দুই পাশে মাটি ভরাট) দেওয়া মাটির সিংহভাগই বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাজ শুরুর পর থেকেই নির্মাণ সামগ্রী ও প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়ম ছিল। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, কার্পেটিং করার মাত্র তিন-চার দিনের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে সামান্য হাতের স্পর্শেই পিচ উঠে যেতে শুরু করে। সেই অনিয়মের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশিত হয়।
সড়কের পাশের বাসিন্দা ও স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি গিয়াস উদ্দিন বলেন, শুরু থেকেই এই সড়কের কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। এলাকাবাসী অনিয়মের প্রতিবাদ করলে উল্টো ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। আমরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যেখানে অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়ার কথা, সেখানে উল্টো সত্য প্রকাশ করায় একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আমরা অবিলম্বে ওই মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, কাজের উচ্চতর তদন্ত এবং বুয়েট বা কুয়েটের মাধ্যমে নির্মাণসামগ্রীর ল্যাব টেস্টের দাবি জানাচ্ছি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী রাস্তার দুই পাশে প্রায় তিন ফুট প্রশস্ত মাটির শোল্ডার নির্মাণের কথা থাকলেও অধিকাংশ স্থানে তা করা হয়নি। এ ছাড়া এজিংয়ের কাজে পুরোনো ও অত্যন্ত নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে। কার্পেটিংয়ের আগে প্রয়োজনীয় প্রাইম কোট ও ট্যাক কোট যথাযথভাবে প্রয়োগ না করা এবং বিটুমিনের সঠিক মান বজায় না রাখার কারণেই মাত্র ১৫ দিনের মাথায় সড়কটি ধসে পড়েছে। তারা অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানান।
এদিকে, সড়ক নির্মাণে অনিয়ম নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের পর গত ৬ জুলাই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড’-এর স্থানীয় প্রতিনিধি ইয়াসিন হোসেন আদালতে ‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকার কোটালীপাড়া প্রতিনিধির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। অভিযুক্ত সাংবাদিকের দাবি, মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। সড়ক নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে জনদৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যেই এই হয়রানিমূলক মামলা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধি ইয়াসিন হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাগুফতা হক বলেন, সড়ক নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পরপরই বিষয়টি তদন্তের জন্য এলজিইডিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুরো বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আমাদের নজরে এসেছে। উপজেলা প্রকৌশলী বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন। তিনি কর্মস্থলে যোগদান করলেই তদন্তের অগ্রগতি জেনে আইনানুগ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ‘গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়)’-এর আওতায় প্রায় ৭৪ লাখ ৬৭ হাজার ৩০১ টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ২৬৫ মিটার দীর্ঘ শিকিরবাজার স্কাউট ভবন থেকে পূর্ব চিত্রাপাড়া পর্যন্ত সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কার্যাদেশ পায় ‘জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড’। প্রতিষ্ঠানটির স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজটি বাস্তবায়ন করছেন ইয়াসিন হোসেন।





