ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পশুর হাটের ইজারা ক্ষমতাসীনদের হাতে

ঈদুল আজহার আর মাত্র দু’দিন বাকি। এরই মধ্যে জমে উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পশুর হাটগুলো। জেলার বিভিন্ন স্থানে কোরবানির পশু কেনাবেচা ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। তবে এবারের হাট ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতাসীনদের দখলদারিত্বের অভিযোগ।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এবার স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে মোট ১১২টি পশুর হাট বসছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, এসব হাটের বড় একটি অংশের ইজারা গেছে বিএনপির নেতাকর্মী ও তাদের ঘনিষ্ঠদের হাতে। ফলে ইজারা প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা থাকলেও শেষ পর্যন্ত অন্য রাজনৈতিক মতের লোকজন কিংবা সাধারণ ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
জেলার সবচেয়ে বড় পৌর এলাকার ভাদুঘর অস্থায়ী পশুর হাটটি ৯৫ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান। তবে স্থানীয়দের দাবি, হাট পরিচালনার মূল নিয়ন্ত্রণ রয়েছে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম সিরাজের ঘনিষ্ঠদের হাতে। তার ভাই আব্দুস সাত্তারসহ বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী মাঠপর্যায়ে হাট পরিচালনায় সক্রিয় রয়েছেন।
শুধু ভাদুঘর নয়, সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের হাটগুলোর ইজারাও গেছে বিএনপি নেতাদের দখলে। নাটাই উত্তর ইউনিয়নের বটতলী বাজার পশুর হাট ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন। নাটাই দক্ষিণ ইউনিয়নের শালগাঁও কালিসীমা মাঠের অস্থায়ী হাট জেলা বিএনপির তাঁতী বিষয়ক সম্পাদক ও সদর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম নিয়েছেন ৭৫ হাজার টাকায়। এছাড়া মজলিশপুর ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন হাট ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমান এবং মাছিহাতা ইউনিয়নের চিনাইর কলেজ মাঠের হাট বিএনপি-সমর্থিত আরিফ মিয়ার নিয়ন্ত্রণে গেছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব খাটিয়ে অনেক হাট নামমাত্র মূল্যে ইজারা নেওয়া হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, মাছিহাতা ইউনিয়নের রাধিকা পুরাতন বাজারের অস্থায়ী পশুর হাট মাত্র ২২ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন মো. নাজিদ উদ্দিন ভূইয়া। স্থানীয়দের দাবি, তিনি তার আত্মীয়তার সূত্রে প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করেই এ সুবিধা পেয়েছেন। যদিও এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
হাট ইজারা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয় অনেক ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিতদের মধ্যেও। তাদের অভিযোগ, টেন্ডার প্রক্রিয়া উন্মুক্ত দেখানো হলেও বাস্তবে ক্ষমতাসীন বলয়ের বাইরে কেউ হাট পায়নি। ফলে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণেই জেলার অধিকাংশ কোরবানির পশুর হাট চলে গেছে।
অন্যদিকে ইজারাদারদের একাংশ বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব থাকলেও ব্যবসায়িক ঝুঁকি কম নয়। বৃষ্টি ও ক্রেতা সংকটের কারণে এখনও প্রত্যাশিত বেচাকেনা হয়নি। ঈদের আগে হাতে মাত্র কয়েকদিন সময় থাকায় অনেকেই মূলধন ফেরত পাওয়া নিয়েই শঙ্কায় আছেন।
জেলা প্রশাসনের উপ-পরিচালক (উপসচিব) শরিফুল ইসলাম বলেন, হাটের তালিকা জেলা প্রশাসনের কাছে থাকলেও কোন হাট কারা পেয়েছেন সেই তথ্য উপজেলা প্রশাসনের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। ঈদের পর সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য জেলা প্রশাসনে জমা হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, হাট ইজারা নিতে কোনো ধরনের দলীয় চাপ প্রশাসনের ওপর আসনেনি। আমরা উন্মুক্ত দরপত্র দিয়েছি। সর্বোচ্চ দরদাতাকেই হাট ইজারা দেওয়া হয়েছিল। সেখানে যেকোনো দলের লোকজন অথবা যেকোনো ব্যক্তি অংশগ্রহণ করতে পারেন। তবে হাট ইজারা কোন দলের ব্যক্তি পেলো সেই বিষয়ে জানার প্রয়োজন নেই।
তিনি আরও বলেন, তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর হাটের ইজারা মূল্য কম পাওয়া গেছে। কারণ গত বছরে হাটের যে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল সেটি অনেক বেশি ছিল। তবে গত দুই বছর আগে হাটের যে মূল্য আমরা দেখেছি সেটি স্বাভাবিক ছিল। সেভাবেই এবছর হাট ইজারা হয়েছে।
এদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কোরবানির পশুর চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার। জেলায় বর্তমানে প্রস্তুত রয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৩৫টি কোরবানিযোগ্য পশু। প্রায় ১৪ হাজার ৭৯২ জন খামারি প্রাকৃতিক উপায়ে পশু মোটাতাজাকরণে যুক্ত রয়েছেন।
স্থানীয় খামারিরা বলছেন, গবাদিপশুর খাদ্যের উচ্চমূল্য, ধানের গুড়ার দাম বৃদ্ধি এবং ভারতীয় চোরাই গরুর সম্ভাব্য প্রবেশ তাদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের আশঙ্কা, সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশ করলে স্থানীয় খামারিরা বড় ধরনের লোকসানে পড়বেন।
.png)






