ক্লান্তি কাটছে না, কারণ হতে পারে এই ঘাটতি

পর্যাপ্ত ঘুম, বিশ্রাম এবং স্বাভাবিক রক্ত পরীক্ষার ফল থাকার পরও যদি দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি না কমে, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ক্ষেত্রে শুধু হিমোগ্লোবিন বা আয়রনের মাত্রা স্বাভাবিক থাকলেই সব ঠিক আছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। কিছু ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি, বিশেষ করে ভিটামিন বি১২, ভিটামিন ডি বা শরীরে আয়রনের মজুত কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দীর্ঘদিনের অবসাদ ও দুর্বলতার কারণ হতে পারে। তাই বারবার ক্লান্তি অনুভব করলে এর সম্ভাব্য কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগছে, কাজে মন বসছে না, শরীরে শক্তি পাচ্ছেন না। এমন হলে অনেকেই প্রথমে রক্ত পরীক্ষা করান। কিন্তু রিপোর্টে দেখা যায়, হিমোগ্লোবিন ও আয়রনের মাত্রা স্বাভাবিক। এরপরও ক্লান্তি কাটে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে শুধু হিমোগ্লোবিন বা আয়রনের রিপোর্ট দেখে নিশ্চিন্ত হওয়া ঠিক নয়। অনেক সময় ভিটামিন বি১২, ভিটামিন ডি বা শরীরের আয়রনের মজুত কমে যাওয়ার মতো লুকানো পুষ্টিঘাটতিও দীর্ঘদিনের ক্লান্তির কারণ হতে পারে। তাই উপসর্গ থাকলে আরও কিছু পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।
হিমোগ্লোবিন স্বাভাবিক হলেও কেন ক্লান্তি হতে পারে?
হিমোগ্লোবিন রক্তে অক্সিজেন বহন করে। কিন্তু শরীরে শক্তি উৎপাদন, স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং পেশির কাজ ঠিক রাখতে আরও অনেক ভিটামিন ও খনিজ প্রয়োজন।
এসব উপাদানের ঘাটতি থাকলে হিমোগ্লোবিন স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও দুর্বলতা, ক্লান্তি ও মনোযোগের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি থাকলে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে।
- সব সময় ক্লান্ত লাগা
- দুর্বলতা
- মনোযোগ কমে যাওয়া
- স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া
- হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশভাব
- মাথা ঘোরা
যারা নিরামিষভোজী, দীর্ঘদিন অ্যাসিড কমানোর ওষুধ খান বা অন্ত্রের কিছু রোগে ভোগেন, তাদের বি১২-এর ঘাটতির ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
শুধু আয়রন নয়, ফেরিটিনও গুরুত্বপূর্ণ
অনেকের হিমোগ্লোবিন স্বাভাবিক থাকলেও শরীরে আয়রনের মজুত কমে যেতে পারে। এই মজুতের পরিমাণ বোঝার জন্য ফেরিটিন পরীক্ষা করা হয়।
ফেরিটিন কমে গেলে শরীরে এখনো রক্তস্বল্পতা না থাকলেও ক্লান্তি, চুল পড়া, মনোযোগের ঘাটতি এবং কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই অবস্থাকে অনেক সময় আইরনের অভাব ছাড়া রক্তশূন্যতা (Iron Deficiency Without Anemia) বলা হয়।
ভিটামিন ডি-এর ঘাটতিও কারণ হতে পারে
ভিটামিন ডি শুধু হাড়ের জন্য নয়, পেশি ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
এই ভিটামিনের ঘাটতি থাকলে অনেকের ক্ষেত্রে সারাক্ষণ ক্লান্তি, পেশিতে ব্যথা, দুর্বলতা ও শরীরে শক্তি কমে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে যারা খুব কম রোদে যান, তাদের ক্ষেত্রে এই ঘাটতি বেশি দেখা যায়।
ক্লান্তির পেছনে আরও যেসব কারণ থাকতে পারে
সব ক্লান্তির কারণ পুষ্টিঘাটতি নয়। আরও অনেক সমস্যার কারণেও এমন হতে পারে। যেমন:
- পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া
- মানসিক চাপ বা উদ্বেগ
- থাইরয়েডের সমস্যা
- অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস
- দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ
- কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
- বিষণ্নতা বা অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
নিচের লক্ষণগুলো থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।
- কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্লান্তি না কমা
- পর্যাপ্ত ঘুমের পরও অবসাদ থাকা
- শ্বাসকষ্ট বা বুক ধড়ফড় করা
- দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
- হাত-পায়ে ঝিনঝিনি
- অতিরিক্ত চুল পড়া
- দৈনন্দিন কাজ করতে কষ্ট হওয়া
কী করবেন?
- নিজে থেকে ভিটামিন বা আয়রনের ওষুধ খাওয়া শুরু করবেন না।
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা করান।
- সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।
- পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
- নিয়মিত শরীরচর্চা করুন।
- দীর্ঘদিন ক্লান্তি থাকলে কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন, শুধু উপসর্গ উপেক্ষা করবেন না।
সব সময় ক্লান্ত লাগলেই যে রক্তস্বল্পতা হয়েছে, এমন নয়। আবার হিমোগ্লোবিন স্বাভাবিক মানেই শরীরে সব পুষ্টি ঠিক আছে, সেটিও ধরে নেওয়া উচিত নয়। ভিটামিন বি১২, ভিটামিন ডি, ফেরিটিনের ঘাটতি কিংবা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যাও দীর্ঘদিনের অবসাদের কারণ হতে পারে। তাই ক্লান্তি যদি নিয়মিত সঙ্গী হয়ে যায়, তাহলে শুধু একটি রিপোর্টের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
সূত্র: এনডিটিভি
.png)





