খরচের সঙ্গে অপেক্ষা বাড়ে, সন্তানের জন্য মেলে না আইসিইউ

খরচের সঙ্গে অপেক্ষা বাড়ে, সন্তানের জন্য মেলে না আইসিইউ
সিরিয়াল দেওয়ার পর চার দিন পেরোলেও আইসিইউ শয্যা পাচ্ছেন না রায়হান হোসেন। ছবি : এশিয়া পোস্ট

একটু পরপর আইসিইউর (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) সামনে উঁকি দিচ্ছেন রায়হান হোসেন। তার উদ্বিগ্নতা ছেলের সুস্থতা নিয়ে। একটি আইসিইউ শয্যা যদি খালি হতো, তাহলে ছেলেকে ভর্তি করাতে পারবেন। কিন্তু সিরিয়াল দেওয়ার পর চার দিন পেরিয়ে গেছে, এখনো মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেই আইসিইউ।

এদিকে চিকিৎসার খরচের ঘোড়া যখন ছুটছে, তখন আইসিইউর অপেক্ষাও শেষ হচ্ছে না রায়হানের। এখন তার আরও ভয়, আইসিইউর শয্যা পেতে পেতে যদি না সন্তানের খারাপ কিছু হয়ে যায়!

ঘটনাটি রাজধানীর শ্যামলীতে অবিস্থত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে। এ হাসপাতালেই গত চার দিন ধরে আইসিইউর অপেক্ষায় হামের বিশেষায়িত ওয়ার্ডে চিকিৎসা চলছে রায়হান হোসেনের একমাত্র ছেলে মুত্তাসিমের। প্রায় আট মাস বয়সী সন্তান হামের ফলে সৃষ্ট নিউমোনিয়ায়ে ভুগছে। শ্বাসকষ্ট অনেক বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন রায়হান ও তার স্ত্রী।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকালে শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের আইসিইউ বিভাগের সামনে রায়হান হোসেনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।

জানা গেছে, এক মাস আগে ডায়রিয়া দেখা দিলে শুরুতে স্থানীয় হাসপাতালে, পরে রাজধানীর মাতুয়াইলে শিশু মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয় মুত্তাসিমকে। চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফেরার দুই সপ্তাহর মাথায় শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে নেওয়া হয় নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে। সেখানে হাম সন্দেহে চিকিৎসক শিশুটিকে রেফার করেন মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে।

এক দিন পর আইসিইউর প্রয়োজনীয়তার কথা জানান সেখানকার চিকিৎসকরা। এক নিকটাত্মীয়র সুপারিশে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা গেলেও, চার দিন পেরোলেও মেলেনি আইসিইউ। সন্তানের জন্য কখন আইসিইউ পাবেন, তা-ও জানেন না রায়হান।

এদিকে আইসিইউর অপেক্ষায় থাকলেও মুত্তাসিমের চিকিৎসা থেমে নেই। যে শয্যায় চিকিৎসা চলছে, তার ভাড়া ১২০০ টাকা। সিবিসিসহ প্রায় সময় নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। এ ছাড়া দুজন মানুষের খাওয়া—সব মিলিয়ে গত এক মাসে সন্তানের চিকিৎসায় ব্যয় ৬০ হাজার টাকার মতো।

রায়হান হোসেন পেশায় একজন ফিজিওথেরাপিস্ট। কাজ করছেন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে। সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে পেশাগত কাজ থেকে দূরে। সন্তানের এই অবস্থায় এখন চাকরি হারানোর শঙ্কাও তার পিছু ছাড়ছে না।

রায়হান হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আজ প্রায় এক মাস ধরে সন্তানকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছি। নিজের যা আছে সবটুকু দিয়েই চেষ্টা করছি ছেলেটাকে যাতে বাঁচাতে পারি। আজ চারটা দিন ধরে একটা আইসিইউ পেতে নানাভাবে চেষ্টা করছি, পাচ্ছি না। সিরিয়াল দিয়ে রেখেছি, কখন পাব জানি না। এদিকে ছেলের শারীরিক অবস্থাও জটিল হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসা চললেও প্রায় সবকিছুই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। আবার নির্দিষ্ট সময় ছাড়া ডাক্তার ও নার্সদের ডাকলেও পাওয়া যায় না। বেশি অনুরোধ করলে রাগ দেখায়। টাকা দিয়ে চিকিৎসা নিলেও, স্টাফদের আচরণে যে আন্তরিকতা থাকা দরকার, তা নেই।’

বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন প্রায় দেড় মাস আগে শুরু হলেও যে হারে কাভারেজ হয়েছে, সে তুলনায় রোগী কমছে না।

গত ২৪ ঘণ্টায় হামে ও হাম সন্দেহে এক হাজার ৬৩১ জনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এই নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৬৭ হাজার ৫৫৪-তে দাঁড়িয়েছে।

সংক্রমণের পাশাপাশি ঘটছে প্রাণহানিও। নতুন করে সাত জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে তিনজনের শরীরে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকি চারজনের শরীরে উপসর্গ ছিল।