ইসিজি রিপোর্ট স্বাভাবিক, তবু থাকতে পারে হৃদ্রোগ

বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা বুক ধড়ফড়ের মতো উপসর্গ থাকলেও অনেক সময় ইসিজি রিপোর্ট স্বাভাবিক আসে। তবে এর অর্থ এই নয় যে হৃদ্যন্ত্রে কোনো সমস্যা নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু ধরনের হৃদ্রোগ সাধারণ বিশ্রাম অবস্থায় করা ইসিজিতে ধরা নাও পড়তে পারে।
কারণ ইসিজি হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যক্রমের একটি নির্দিষ্ট সময়ের চিত্র তুলে ধরে, কিন্তু সব ধরনের গঠনগত বা রক্তপ্রবাহজনিত সমস্যা শনাক্ত করতে পারে না। তাই উপসর্গ বা ঝুঁকির কারণ থাকলে শুধু একটি স্বাভাবিক ইসিজি রিপোর্টের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষাও করানো জরুরি।
কেন স্বাভাবিক ইসিজিতেও হৃদ্রোগ থাকতে পারে?
একটি সাধারণ ইসিজি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যক্রম রেকর্ড করে। তাই যেসব সমস্যা মাঝে মাঝে হয় বা বিশ্রামের সময় প্রকাশ পায় না, সেগুলো এই পরীক্ষায় ধরা নাও পড়তে পারে।
এ ছাড়া হৃদ্যন্ত্রের গঠনগত কিছু সমস্যা বা রক্তনালির প্রাথমিক পর্যায়ের রোগও অনেক সময় স্বাভাবিক ইসিজিতে বোঝা যায় না।
কোন কোন হৃদ্রোগ ইসিজিতে ধরা নাও পড়তে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিচের কিছু সমস্যায় ইসিজি স্বাভাবিক আসতে পারে।
- প্রাথমিক পর্যায়ের করোনারি আর্টারি ডিজিজ
- হৃদ্যন্ত্রের ক্ষুদ্র রক্তনালির রোগ বা মাইক্রোভাসকুলার ডিজিজ
- কিছু হার্ট ভালভের সমস্যা
- মাঝে মাঝে হওয়া অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন
- হৃদ্রোগের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু অবস্থা
কোন লক্ষণগুলো অবহেলা করবেন না?
ইসিজি স্বাভাবিক হলেও বুকে চাপ বা ব্যথা, হাঁটলে বা সিঁড়ি ভাঙলে শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড় করা, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, কাঁধ, বাহু, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা এবং পা বা গোড়ালি ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গ থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং ঝুঁকির কারণ বিবেচনা করে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী আরও কিছু পরীক্ষা দিতে পারেন। যেমন-
ইকোকার্ডিওগ্রাম: এটি আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে হৃদ্যন্ত্রের গঠন, পেশির কার্যকারিতা এবং ভালভের অবস্থা দেখা হয়।
স্ট্রেস টেস্ট: হাঁটা বা ব্যায়ামের সময় হৃদ্যন্ত্র কীভাবে কাজ করছে, তা এই পরীক্ষায় মূল্যায়ন করা হয়। বিশ্রামের সময় ধরা না পড়া কিছু সমস্যা এতে শনাক্ত হতে পারে।
হোল্টার মনিটর: ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ধরে হৃদ্স্পন্দন রেকর্ড করা হয়। মাঝে মাঝে হওয়া অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন শনাক্ত করতে এটি কার্যকর।
সিটি করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফি: হৃদ্যন্ত্রের রক্তনালিতে সংকোচন বা ব্লকেজ আছে কি না তা বিস্তারিতভাবে দেখা যায়।
রক্ত পরীক্ষা: বিশেষ করে ট্রোপোনিন পরীক্ষার মাধ্যমে হৃদ্পেশির ক্ষতির ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। এছাড়া কোলেস্টেরল ও অন্যান্য রক্ত পরীক্ষাও ঝুঁকি মূল্যায়নে সহায়ক।
কারা বেশি সতর্ক থাকবেন?
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে যাদের, ধূমপায়ী, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি, পরিবারে অল্প বয়সে হৃদ্রোগের ইতিহাস রয়েছে এবং দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন করেন যারা - এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ইসিজি স্বাভাবিক হলেও উপসর্গ থাকলে বাড়তি মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।
কখন জরুরি চিকিৎসা নেবেন?
তীব্র বুকব্যথা, ব্যথা বাহু, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়া, শ্বাস নিতে কষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বমি বমি ভাব বা বমি এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ/ লক্ষণগুলো দেখা দিলে ইসিজি রিপোর্ট যাই হোক না কেন, দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
ইসিজি হৃদ্রোগ নির্ণয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলেও এটি সব ধরনের হৃদ্সমস্যা শনাক্ত করতে পারে না। তাই বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড় বা অন্য কোনো সন্দেহজনক উপসর্গ থাকলে শুধু স্বাভাবিক ইসিজি রিপোর্ট দেখে নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত পরীক্ষা করালে অনেক গুরুতর হৃদ্রোগ শুরুতেই শনাক্ত করা সম্ভব, যা দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে এবং জটিলতা কমাতে সাহায্য করে।
সূত্র: মেডান্টা
.png)






