যেসব খাবার খেলে কমে যাবে শুক্রাণু, বলছে গবেষণা

সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করলে বেশির ভাগ সময় নারীর স্বাস্থ্য নিয়েই বেশি আলোচনা হয়ে থাকে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্ধ্যাত্বের প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রেই বর্তমানে পুরুষের বিভিন্ন সমস্যাও ভূমিকা রাখতে পারে।
পুরুষের প্রজননক্ষমতা ভালো রাখতে কী করা উচিত, সে বিষয়ে বেশ কিছু পরিচিত পরামর্শ রয়েছে। যেমন খুব টাইট অন্তর্বাস না পরা, কোলে ল্যাপটপ রেখে দীর্ঘ সময় কাজ না করা কিংবা যত দ্রুত সম্ভব ধূমপান ছেড়ে দেওয়া। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পাশাপাশি আরও একটি সহজ বিষয়েও নজর দেওয়া দরকার, আর সেটি হলো প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস।
ওয়েক ফরেস্ট ইউনিভার্সিটির ইউরোলজি বিভাগের মেনস হেলথ ক্লিনিকের পরিচালক ডা. রায়ান টারলেকির মতে, গত কয়েক দশকে পুরুষদের প্রজননক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ কারণে অনেক পুরুষই জানতে চান, কীভাবে স্বাভাবিকভাবে উর্বরতা বাড়ানো যায়।
ডা. টারলেকি বলেন, অনেক পুরুষই জানেন না যে প্রতিদিনের খাবারও শুক্রাণুর স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায়ও একই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকা খাবার শুক্রাণুর সংখ্যা, গঠন এবং চলাচলের সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
শুক্রাণুর স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সাধারণত তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয়। এগুলো হলো শুক্রাণুর সংখ্যা, শুক্রাণুর স্বাভাবিক গঠন এবং ডিম্বাণুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বা গতিশীলতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস এই তিনটি ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাস্থ্যকর খাবার যেমন প্রজননস্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে, তেমনি কিছু খাবার অতিরিক্ত খেলে শুক্রাণুর সংখ্যা, গতি ও গুণগত মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, কোনো একটি খাবার একাই বন্ধ্যাত্বের কারণ হয় না, আরও বিভিন্ন কারণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
চলুন জেনে নিই পুরুষের প্রজননক্ষমতা ভালো রাখতে কোন কোন খাবার এড়িয়ে চলা ভালো।
প্রক্রিয়াজাত মাংস
সসেজ, সালামি, বেকন, হ্যাম ও পেপারোনির মতো প্রক্রিয়াজাত মাংস নিয়মিত বেশি খেলে শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান কমে যেতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এর পরিবর্তে মাছ, মুরগি বা উদ্ভিজ্জ প্রোটিন বেছে নেওয়া ভালো।
ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার
ডিপ ফ্রাই করা খাবার, কিছু বেকারি পণ্য, কেক, বিস্কুট, কুকিজ ও ফাস্ট ফুডে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণ শুক্রাণুর সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি স্থূলতার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। স্থূলতাও পুরুষের প্রজননক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ।
কোমল পানীয় ও এনার্জি ড্রিংক
অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালোরিযুক্ত কোমল পানীয় এবং এনার্জি ড্রিংক নিয়মিত পান করলে শুক্রাণুর গতি ও সংখ্যা কমে যেতে পারে বলে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত চিনি শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়াতে পারে, যা শুক্রাণুর ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
উচ্চ পারদযুক্ত মাছ
সব মাছ ক্ষতিকর নয়। বরং বেশির ভাগ মাছই স্বাস্থ্যকর।
তবে সোর্ডফিশ, কিং ম্যাকারেল, টাইলফিশ এবং কিছু বড় আকারের টুনা মাছে পারদের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। অতিরিক্ত পারদ প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে কম পারদযুক্ত মাছ, যেমন স্যামন, সারডিন বা অন্যান্য নিরাপদ মাছ পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উপকারী হতে পারে।
অতিরিক্ত সয়া জাতীয় খাবার
সয়াবিন ও সয়া দিয়ে তৈরি খাবারে আইসোফ্লাভোন নামের উদ্ভিজ্জ যৌগ থাকে, যা শরীরে ইস্ট্রোজেনের মতো কিছু প্রভাব ফেলতে পারে।
খুব বেশি পরিমাণে সয়া খেলে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ও শুক্রাণুর মানে প্রভাব পড়তে পারে বলে কিছু গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সাধারণ পরিমাণে সয়া খাওয়ার ক্ষতি নিয়ে এখনো নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই অতিরিক্ত গ্রহণ না করাই ভালো।
ক্যানজাত খাবার
কিছু ক্যানজাত খাবারের আবরণে বিসফেনল এ বা BPA নামের একটি রাসায়নিক থাকতে পারে। এই রাসায়নিককে হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
যদিও বর্তমানে অনেক নির্মাতা BPA-মুক্ত প্যাকেজিং ব্যবহার করছেন, তবু সম্ভব হলে তাজা খাবার বেছে নেওয়া ভালো।
অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ফুল-ফ্যাট দুধ, চিজ বা অন্যান্য উচ্চ চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার বেশি খেলে শুক্রাণুর গতি ও সংখ্যা কমতে পারে। তবে এ বিষয়ে গবেষণার ফল একেবারে চূড়ান্ত নয়।
তাই পরিমিত পরিমাণে এবং সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
অ্যালকোহল
নিয়মিত বা অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমাতে পারে এবং শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণগত মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা বা যতটা সম্ভব কমিয়ে দেওয়াই ভালো।
শুধু খাবার নয়, যেসব অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ
পুরুষের প্রজননক্ষমতা ভালো রাখতে বিশেষজ্ঞরা আরও কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দেন।
- স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা
- নিয়মিত ব্যায়াম করা
- প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানো
- ধূমপান ও মাদক এড়িয়ে চলা
- পর্যাপ্ত ফল, শাকসবজি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া
- জিঙ্ক, সেলেনিয়াম ও ওমেগা ৩ সমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা
চিকিৎসকের পরামর্শ কি দরকার?
যদি এক বছর নিয়মিত অসুরক্ষিত সহবাসের পরও সন্তান না আসে, অথবা আগে থেকেই শুক্রাণুর সমস্যা, হরমোনজনিত রোগ বা অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে, তাহলে একজন ইউরোলজিস্ট বা বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে বীর্য পরীক্ষা এবং অন্যান্য মূল্যায়নের মাধ্যমে কারণ নির্ণয় করা হয়।
কোনো একটি খাবার খাওয়ার কারণে পুরুষ বন্ধ্যাত্ব হয় না। তবে দীর্ঘদিন অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি, ট্রান্স ফ্যাট ও অ্যালকোহল গ্রহণ শুক্রাণুর স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে শুধু একটি খাবার বাদ দেওয়ার বদলে স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং ভালো জীবনযাপনকে গুরুত্ব দেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সূত্র:প্রিসটিন কেয়ার
.png)





