টাইপ ১ ডায়াবেটিস নিয়ে যা জানা জরুরি

ডায়াবেটিসের কথা উঠলেই বেশির ভাগ মানুষ টাইপ ২ ডায়াবেটিসের কথা ভাবেন। কিন্তু ডায়াবেটিসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধরন হলো টাইপ ১ ডায়াবেটিস। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভুল করে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলোকে আক্রমণ করে। ফলে শরীরে ইনসুলিন প্রায় সম্পূর্ণভাবে তৈরি হওয়া বন্ধ হয়ে যায়।
যদিও এই রোগ শিশু ও কিশোরদের মধ্যে বেশি ধরা পড়ে, তবে যেকোনো বয়সেই টাইপ ১ ডায়াবেটিস হতে পারে। সঠিক চিকিৎসা ও নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
টাইপ ১ ডায়াবেটিস আসলে কী
আমরা যে খাবার খাই, তা থেকে তৈরি হওয়া গ্লুকোজ শরীরের কোষে পৌঁছে শক্তি জোগাতে ইনসুলিনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু টাইপ ১ ডায়াবেটিসে অগ্ন্যাশয় প্রয়োজনীয় ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায় এবং চিকিৎসা না করলে তা মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
টাইপ ১ ডায়াবেটিসের সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে গবেষকদের ধারণা, এটি মূলত অটোইমিউন প্রতিক্রিয়ার কারণে হয়। অর্থাৎ শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভুল করে ইনসুলিন উৎপাদনকারী বিটা কোষ ধ্বংস করে ফেলে।
এ ছাড়া কিছু বিষয় ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যেমন- পারিবারিক ইতিহাস, নির্দিষ্ট কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্য ও ভাইরাসজনিত সংক্রমণ বা পরিবেশগত কিছু প্রভাব।
তবে অতিরিক্ত চিনি খাওয়া বা জীবনযাপনের কারণে টাইপ ১ ডায়াবেটিস হয় না।
টাইপ ১ ডায়াবেটিসের লক্ষণ
লক্ষণগুলো সাধারণত দ্রুত দেখা দেয় এবং কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তীব্র হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বারবার প্রস্রাব হওয়া, অতিরিক্ত পিপাসা লাগা, সব সময় ক্ষুধা লাগা, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ক্লান্তি, চোখে ঝাপসা দেখা, ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া এবং বারবার সংক্রমণ হওয়া।
শিশুদের ক্ষেত্রে হঠাৎ বিছানা ভিজিয়ে ফেলা বা ঘন ঘন প্রস্রাব করাও একটি লক্ষণ হতে পারে।
জরুরি লক্ষণগুলো কী?
অনেক সময় টাইপ ১ ডায়াবেটিস প্রথম ধরা পড়ে ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস বা ডিকেএ নামের একটি গুরুতর অবস্থার মাধ্যমে।
এ অবস্থায় ফলের মতো গন্ধযুক্ত শ্বাস, বমি বমি ভাব বা বমি, পেটব্যথা, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা এবং বিভ্রান্তি বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। এটি একটি মেডিকেল জরুরি অবস্থা।
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
চিকিৎসক সাধারণত কয়েকটি পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করেন।
- রক্তে শর্করা পরীক্ষা
- HbA1c পরীক্ষা
- অটোঅ্যান্টিবডি পরীক্ষা
- প্রয়োজন হলে প্রস্রাবে কিটোন পরীক্ষা
এসব পরীক্ষার মাধ্যমে টাইপ ১ ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের পার্থক্য নির্ণয় করা সম্ভব হয়।
চিকিৎসা কী?
বর্তমানে টাইপ ১ ডায়াবেটিসের কোনো স্থায়ী নিরাময় নেই। তাই সারাজীবন এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।
চিকিৎসার প্রধান অংশগুলো হলো-
- প্রতিদিন ইনসুলিন নেওয়া
- নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা
- সুষম খাদ্যাভ্যাস
- কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বুঝে খাবার খাওয়া
- নিয়মিত শরীরচর্চা
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনসুলিনের মাত্রা পরিবর্তন করা হতে পারে।
চিকিৎসা না করলে কী হতে পারে?
রক্তে শর্করা দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন - হৃদ্রোগ, কিডনির ক্ষতি, চোখের রেটিনার সমস্যা, স্নায়ুর ক্ষতি, পায়ের ক্ষত, উচ্চ রক্তচাপ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি।
তবে নিয়মিত চিকিৎসা ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখলে এসব জটিলতার ঝুঁকি অনেক কমানো সম্ভব।
আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য কিছু পরামর্শ
- ইনসুলিন নেওয়া কখনো বন্ধ করবেন না।
- নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করুন।
- সব সময় জরুরি খাবার বা গ্লুকোজ সঙ্গে রাখুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস মেনে চলুন।
- নিয়মিত চোখ, কিডনি ও পায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন।
- পরিবার ও কাছের মানুষকে রোগ সম্পর্কে জানিয়ে রাখুন, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে তারা সাহায্য করতে পারেন।
টাইপ ১ ডায়াবেটিস একটি আজীবন থাকা রোগ হলেও এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নিয়মিত ইনসুলিন গ্রহণ, রক্তে শর্করা পর্যবেক্ষণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক, কর্মক্ষম ও সক্রিয় জীবন কাটাতে পারেন। তাই লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে পরীক্ষা করানো এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক
.png)






